বাইরে চাকচিক্য, আর ভেতর যেনো অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে নগর ভবন। দুর্নীতির এই গভীরতা মাপকাঠিতে হিসেব করার নয়, কেবল এক কর্মকর্তার অনিয়ম-দুর্নীতির খতিয়ান নিরীক্ষা করেও বের করা কঠিন। এই কর্মকর্তার নাম হানিফুর রহমান। তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর আস্থাভাজন সিসিক’র প্রশাসনিক ও কনজারভেন্সী শাখায় কর্মরত। তার জাদুর মায়াজালে বন্দি খোদ মেয়রও। শুধু নগরভবনে তার আধিপত্য সীমাবদ্ধ নয়। তার দাপট রয়েছে প্রশাসনের রন্দ্রে রন্দ্রে।
নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, আর বাইরের অবৈধ কাজকারবার থেকে মাসোহারা আদায়ে সিদ্ধহস্ত তিনি। এই দুই খাত থেকেই কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন হানিফ। এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিসিকের অনেকেই জানিয়েছেন, শুধু রেস্টুরেন্টের ময়লা অপসারণ করেই তার মাসিক আয় ৪/৫ লাখ টাকা। এর বাইরে মেডিকেলের বর্জ্য অপসারণ থেকে সমপরিমাণ টাকা আসে তার পকেটে। এভাবে মেয়র আরিফুল হকের দুই মেয়াদে কনজারভেন্সী শাখায় থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে মাসোহারা আদায় করেছেন তিনি। এসব টাকা হাতের লেখা রশিদ দিয়ে নগদে আদায় করে নেন বলে জানিয়েছেন রেস্তোঁরা মালিকসহ সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ২০১৩ সালে আরিফুল হক চৌধুরী মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে প্রশাসনিক শাখা পুরোদস্তে নিয়ন্ত্রণ চলে যায় হানিফের হাতে। এই দুই মেয়াদে হানিফের হাত ধরে অন্তত ৪শ’র অধিক লোক নিয়োগ হয়েছে সিসিকে। দফতর বুঝে রয়েছে নিয়োগের রকম ফের বাণিজ্য।
সূত্রমতে, মাস্টাররোলে নিয়োগপ্রাপ্ত চার শতাধিক লোকের কাছ থেকে জনপ্রতি অন্তত ৩/৪লাখ টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। আর প্রকৌশল শাখা, লাইসেন্স, স্বাস্থ্য শাখাসহ গুরুত্ব শাখায় চাকরীতে যোগদানকারীরা তাকে দিতে হয়েছে ৫ লাখ টাকা করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিসিকের প্রকৌশল শাখার এক কর্মী জানান, এই দফতরে নিয়োগ পেতে হলে ৫ লাখ টাকা দিতে হয়। গত বছরেও সিলেটের একটি বেসরকারি ইউনিভার্সিটির কয়েকজনকে পূর্ত শাখায় বড় অংকের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর মাস্টাররোলে নিয়োগকৃতদের প্রতি মাসের বেতন থেকে অন্তত ৪দিনের বেতনের টাকা কর্তন করে রাখা হয়। এই টাকারও কোনো হদিস নেই।
এর বাইরেও রয়েছে আরো অগণিত খাত। এসব খাত থেকে এক-দুই কোটি নয়, কি পরিমাণ টাকা আয় করা হয়, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি কেউই। তবে এই টাকার ভাগ কারা পান, তা কেবল হানিফ-ই জানেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কনজারভেন্সী শাখার কর্মীদের জনপ্রতি মজুরী ৫০০ টাকা থাকলেও তা থেকে ২শ’ টাকা করে কেটে রাখাও অভিযোগ খোদ শ্রমিকদের। তবে চাকরী হারানোর ভয়ে নাম প্রকাশ কিংবা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ তারা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিসিকের কনজারভেন্সী শাখায় কাজ করেন এমন শ্রমিক আছেন ৪শ’। তাদের মধ্যে অফিসে নাইটগার্ড ও রিকশা নিয়ন্ত্রণে ১২০ জন, প্রতিটি ট্রাকে ৩/৪ জন করে ১৫০ জন, বিভিন্ন অফিস আদালতে ৩০/৪০ জন, ডাম্পিংয়ে কাজ করে আরো ১৫/২০ জন। আর ময়লার গাড়িতে কাজ করেন আরো ১৫০ জন। তাদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো ভাবে ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা দিয়ে সিসিকে চাকরী নিয়েছেন। আর ময়লার গাড়ি ১০০টির মধ্যে প্রতিদিন অন্তত ৬০/৬৫টি গাড়ি চলে। এসব গাড়ি দিয়ে শহরের আবর্জনা পরিস্কারের পাশাপাশি নগরীর আড়াই শতাধিক রে¯েঁÍারা ও শতাধিক হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্য অপসারণ করতে নেওয়া হয় ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা করে। এই খাত থেকে রাজস্বে নামমাত্র টাকা দিয়ে বিপুল অংকের টাকা পকেটস্থ করা হয়। আর রেস্তোঁরার উচ্ছিষ্ট খাবার বিক্রি করা হয় বিভিন্ন মাছের খামারে। সেসব খামারীদের সঙ্গেও চুক্তিবদ্ধ হয়ে টাকা আদায় করেন হানিফের বিশ্বস্থ লোকজন। এর বাইরেও নগর এলাকায় ব্যানার টানাতে, খালি বিলবোর্ডে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যও ব্যানার সাটাতে কনজারভেন্সী শাখা টাকা আদায় করে থাকে, এমনটি জানা গেছে বিভিন্ন ছাপাখানা সূত্রে। তবে এসবের এক টাকাও সরকারি কোষাগারে যায় না। এমনটি নগরীর সাঁটানো ব্যানার ফেস্টুন খুলেও বিক্রি করা হয়।
যদিও হানিফুর রহমান বলেছেন, রেস্তোরা ও ক্লিনিকের টাকা চালান মারফত ব্যাংকে জমা হয়। তবে রেস্তোঁরার উচ্ছিষ্ট খাবার খামারে বিক্রি, ব্যানার ফেস্টুন থেকে টাকা আদায়ের বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।
এছাড়া নগরের কালিঘাট থেকে তার নিজস্ব খামারের জন্য ক্রয়কৃত খৈল, ভ‚সি, গুড়া সরকারি গাড়ি দিয়ে পাঠান মৌলভীবাজারের আদমপুর গ্রামে। এটাও অস্বীকার করেন তিনি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে হানিফুর রহমান বলেন, অফিসে মাস্টাররোলে কতজন চাকরী করে তা জানা নেই। এ যাবত কারো কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। কেউ বলতেও পারবে না। আর রেস্তোঁরার বর্জ ব্যবস্থাপনার টাকা ব্যাংকে জমা হয়। তবে কি মাসে কতটি রেস্তোরার পরিমাণ টাকা জমা হয়, তা তার জানা নেই।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



