মামলা করেন দাদা। সেই মামলার রায় হাতে পান নাতি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে আইনি লড়াই চললেও শেষ হয় না। শেষ হওয়ার উপক্রম হলেও লড়াই বাঁচিয়ে রাখা হয়। কারণ এখানে রয়েছে নানামুখি স্বার্থ। বাদী-বিবাদীদের চেয়ে বড় স্বার্থ আইনজীবী, আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। স্বার্থের দুগ্ধদায়ী গাভির নাম হচ্ছে ‘দেওয়ানি মামলা’। এ মামলা সহায়-সম্পত্তির বিরোধ থেকে উৎসরিত হয়। বলা হয়- দেওয়ানি মামলার শুরু আছে শেষ নেই।
আদলতে তারিখের পর তারিখ পড়ে। বিচারক বদল হন। বাদী-বিবাদী হাজিরা দেন। এক মামলা থেকে সৃষ্টি হয় আরেক মামলা। মামলার পেছনে অর্থ ঢেলে নিঃস্ব হন বিচারপ্রার্থী। মামলা দায়ের করে ভাগ্যবান কিছু বাদী ১০ বছরে ফলাফল পেলেও বেশিরভাগ বাদী এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ফলাফল পাননি- এমন দৃষ্টান্ত অগনিত।
এমনই বেলাল আহমদ (৪৫) নামের একজন। বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজারে। জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে ২০০৫ সালে তার বাবা জমির উদ্দিন বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন। বাদী মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না দেখে ১০ বছর আগে মারা গেছেন। এখন মামলার বাদী তার ছেলে বেলাল আহমদ মামলার শেষ দেখতে আদালতে ঘুরছেন। কিন্তু আট বছরেও মামলার ফলাফল পাননি। তিনি বলেন, বিচারক আসেন-বিচারক বদলি হয়ে যান। আমার মামলার কিনারা হয় না!
আইনজ্ঞরা বলছেন, ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধি মামলা পরিচালনার অনুপযোগী। এ আইনের প্রয়োগ পদ্ধতিও আধুনিক নয়। দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রিতা লাঘবে প্রথমেই প্রয়োজন আইনের সংস্কার।
জানা যায়, জেলা ও দায়রা জজের অধীনে ৪২ বিচারিক আদালত, ৪টি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, একটি সাব জজ আদালত, ৪টি বিশেষ আদালতসহ চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, পারিবারিক আদালত, সার্ভে ট্রাইব্যুনাল, সদরসহ ১৩ উপজেলায় একটি করে সিভিল আদালত একটি করে আমলি গ্রহণকারী আদালত (কগনিজেন্স কোর্ট) রয়েছে। এছাড়া মহানগর দায়রা আদালতের অধীনে বিচারালয় রয়েছে ১১টি। এর মধ্যে একটি অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালত, দুটি যুগ্ম দায়রা আদালত, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ছাড়াও মেট্রোপলিটন এলাকার ৬টি থানার পৃথক ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রয়েছে। এসব আদালতের অনেকটিতে বিচারকের পদ শূন্য রয়েছে। এসব আদালতের বিচারকের পদ শূন্য থাকায় গড়ে ওঠেছে মামলার পাহাড়। ঝুলে আছে লক্ষাধিক মামলার কার্যক্রম। ফলে দীর্ঘদিনও মামলার বিচারকাজ শেষ না হওয়ায় ভোগান্তির পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদের সময় এবং অর্থ দুটোই নষ্ট হচ্ছে।
কয়েকজন আইনজীবী জানান, অনেক মামলা হাইকোর্টে স্থগিতাদেশের কারণে বিচারকার্য ঝুলে যায়। তাই সিলেটে বিভাগীয় হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন হলে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের আবেদনের মাধ্যমে মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। আবার অনেক কোর্টের কার্যক্রম বিকেলে হয় না। সে ক্ষেত্রে পূর্ণ কর্মঘণ্টার ব্যবহার হলেও অনেক মামলার নিষ্পত্তি হবে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
এ ব্যাপারে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. সামছুল হক বলেন, গুরুত্বপূর্ণ আদালতসহ ৮টি বিচারকের পদশূন্য রয়েছে। এ অবস্থায় মামলার জট কমতে আরো সময় লাগবে। বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো খুবই জরুরী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের ৬০টি আদালতে লক্ষাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে জেলা ও দায়রা জজের অধীন ২২টি আদালতে সাড়ে ২৮ হাজার মামলা রয়েছে। জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রায় ৫ হাজার মামলাসহ ল্যান্ড সার্ভে আদালতে ২০ হাজারেরও বেশি মামলা ঝুলে আছে। প্রতিদিন এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন মামলা। কিন্তু এ মামলা জট কিভাবে নিরসন হবে-যুতসই কোনো জবাব নেই কারো কাছেই।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



