কঠোর হচ্ছে চা শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন। মহাসড়কের পর এবার তারা অবরোধ করেছে রেলপথ। দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা নির্ধারণের দাবিতে দ্বিতীয় দফা সমঝোতার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন ও ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছে সিলেট অঞ্চলের সব চা বাগানে শ্রমিকরা।
এদিকে দ্বিতীয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সমঝোতা শেষে শ্রমিক নেতারা বাগানগুলোতে ফিরলে অনেক জায়গায় লাঞ্ছিত হন। এর আগে সমঝোতা মেনে কাজে ফেরেন মৌলভীবাজারে গাজীপুর চা বাগান ও সিলেটের লাক্করতলা চা বাগানের শ্রমিকরা। কিন্তু গতকাল আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে আবার আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন ওই দুই বাগানের শ্রমিকরাও।
মৌলভীবাজার : মঙ্গলবার মৌলভীবাজারের বিভিন্ন স্থানে আঞ্চলিক মহাসড়ক ও সিলেট-ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের কুলাউড়া উপজেলা শহরের রেলগেট এলাকায় প্রায় হাজারখানেক শ্রমিক চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি আটকে দেন। শ্রমিকরা ঢাকা-বিয়ানীবাজার আঞ্চলিক সড়কও অবরোধ করেছেন। রেলগেট এলাকায় বিক্ষোভে নেতৃত্বে থাকা কালিটি চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সাধারণ সম্পাদক উত্তম গোয়ালা বলেছেন, ৭টি চা বাগানের শ্রমিকরা তাদের সঙ্গে বিক্ষোভে আছেন।
চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা করার দাবিতে কয়েক দিন ধরে আন্দোলন করছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চা শ্রমিকরা। বিক্ষোভ মিছিলের পাশাপাশি চা বাগানে পালন করছেন ধর্মঘট।
গত শনিবার চা শ্রমিকদের মজুরি ১৪৫ টাকা নির্ধারণ করার পর অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে শ্রমিকদের একাংশ আন্দোলন চালিয়ে যান। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার আশ্বাসে সোমবার দুপুরে শ্রমিকদের একাংশ আবার আন্দোলন প্রত্যাহার করে কাজে ফেরেন। এরপরও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন চা বাগানের শ্রমিকরা।
এদিকে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতিকে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে। সোমবার সকালে তাকে মারধর করেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা ভ্যালির আওতাধীন কালীঘাট চা বাগানের শ্রমিকরা।
জানা গেছে, সোমবার সকালে শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা ভ্যালির আওতাধীন কালীঘাট চা বাগানে যান বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পঙ্কজ কন্দ। তিনি আন্দোলনরত শ্রমিকদের আন্দোলন স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানাতে আসেন। এ সময় চা শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে মারধর করেন। পাশাপাশি তারা চা বাগানের ট্রাকও আটকে দেন। বিষয়টি নিয়ে জানতে পঙ্কজ কন্দের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তার মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
আন্দোলনের বিষয়ে কালীঘাট পঞ্চায়েত সভাপতি অবাং তাতি বলেন, আমরা তাদের নেতা বানিয়েছি। কিন্তু তারা যদি আমাদের সমস্যা না বোঝেন তা হলে তাদের নেতা থাকার দরকার নেই। আমাদের মাঠে নামিয়ে তারা উধাও হয়ে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী টিভিতে এসে ৩০০ টাকা মজুরি হবে এই ঘোষণা দিলে আমরা আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াব। নয়তো আমাদের আন্দোলন চলবে।
শুধু তাকেই নই, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পালকেও শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে। এমনকি চা শ্রমিক ইউনিয়নের মনু-ধলই ভ্যালির সেক্রেটারি নির্মল দাশ পাইনকার বাড়ি গতকাল ঘেরাও করার অভিযোগ আছে।
চা শ্রমিক ইউনিয়নের আরেক সহসভাপতি জেসমিন আক্তার বলেন, আমরা শুনেছি পঙ্কজ দাদাকে মারধর করা হয়েছে। শুধু তাকে নয়, বিভিন্ন জায়গায় যারা শ্রমিকদের বুঝিয়ে কাজে যোগ দিতে বলছেন তাদের ধাওয়া দেওয়া হচ্ছে, মারধর করা হচ্ছে। আমরা কিন্তু বের হতে পারছি না। বের হলেই মার খাওয়ার আশঙ্কা আছে। সর্বশেষ ২২ আগস্ট ভোররাতে জেলা চা শ্রমিকদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান।
সিলেট : সিলেটে চা বাগান পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন বাগান পঞ্চায়েতের মধ্যে দিনভর আলোচনার পরও ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। এতে কর্মবিরতি প্রত্যাহার না করে তা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারী চা শ্রমিকরা।
মঙ্গলবার দুপুরে সিলট গলফ ক্লাবে সিলেট ভ্যালির ২৩ বাগানের পঞ্চায়েত নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন শ্রমিক ইউনিয়ন নেতারা। এ সময় গলফ ক্লাবের বাইরে অবস্থান নিয়ে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। এ সময় বিভিন্ন বাগান থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে চা শ্রমিকরা এসে জড়ো হন এখানে। মঙ্গলবার পঞ্চদশ দিনের মতো সিলেট ভ্যালির সব কটি চা বাগানে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চা শ্রমিকেরা তাদের কর্মবিরতি পালন করেন।
এর আগে সোমবার সকাল থেকে সিলেট ভ্যালির ২৩টি চা বাগানের মধ্যে ৪টি বাগানে শ্রমিকরা কাজে যোগদান করেন। আর ১৯ বাগানের শ্রমিকরা কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করেন। তবে মঙ্গলবার আর ২৩ বাগানের চা শ্রমিকরা কাজে না গিয়ে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করেন।
কামাইছড়া বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি বিমল ভর জানান, শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তারা কোনো অবস্থায়ই মানছেন না। প্রধানমন্ত্রী নিজে আশ্বাস দিয়েছেন কি না, সেটি তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাই ৩০০ টাকা মজুরি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
হবিগঞ্জ : মজুরি বৃদ্ধির দাবি আদায়ে অনড় রয়েছে হবিগঞ্জের লস্করপুর ভ্যালির ২৩টি চা বাগানের শ্রমিকরা। মঙ্গলবার সকালেও শ্রমিকরা চুনারুঘাটের আমু বাগানে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। এ সময় তারা ৩০০ টাকা দৈনিক মজুরি ছাড়া কাজে ফিরবেন না বলে জানান। একই সঙ্গে ১২০ টাকা মজুরিতে কাজে যোগ দেওয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করায় চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ করেন।
এ ছাড়া ৩০০ টাকা মজুরির দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশের চা শ্রমিকরা কাজে ফিরলেও তারা ফিরবেন না বলে হুঁশিয়ারি দেন। রাতের আঁধারে শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা ১২০ টাকা মজুরিতে যে স্বাক্ষর করেছেন, সেটি তারা মানেন না বলেও জানান।
চান্দপুর চা বাগানের শ্রমিক বীরেন তন্তুবায় বলেন, আমরা আজকে ১৫ দিন ধরে কর্মবিরতি করছি ৩০০ টাকা মজুরির জন্য। এতে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখন ১৪৫ টাকায় কাজে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
চান্দপুর চা-বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সাধন সাওতাল বলেন, আমাদের শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ কাজে যাওয়ার জন্য নির্দেশনা দেয়নি। তারা যদি প্যাডের মাধ্যমে চিঠি দিয়ে কাজে যাওয়ার নির্দশনা দেয় তা হলে আমরা কাজে যাব, তবে অবশ্যই ৩০০ টাকা মজুরি নিয়ে। এর কমে হলে আমরা কাজে যাব না।
বাংলাদেশ চা কন্যা নারী সংগঠনের সভাপতি খায়রুন আক্তার বলেন, আমাদের শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা রাতের আঁধারে গিয়ে হাত মিলিয়েছে। তাতেও লাভ হবে না। ৩০০ টাকা মজুরি ছাড়া কোনো শ্রমিক কাজে ফিরবে না।
নতুনসিলেট২৪ডটকম / এএ
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



