নেতাকর্মীদের অবমূল্যায় করে কমিটি দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে দল ছাড়লেন সিলেটে রাজপথ কাঁপানো বিএনপি নেতা কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান।
বুধবার (১৮ আগস্ট) সন্ধ্যায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বরাবরে পদত্যাগপত্র পাঠানোর পর রাতেই সিলেট নগরের মিরাবাজারে একটি হলরুমে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এসময় তাঁর সঙ্গে বিএনপি ও অংগসংগঠনের শত শত নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
তবে বিএনপির সকল পদ পদবী থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও অন্য কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেবেন না তিনি। বরং রাজনীতির বাইরে থেকে দেশের জন্য কাজ করে যাবেন, বলে ঘোষণা দেন।
১৯৮৫ সালে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান। বিগত দিনে বিএনপির সকল আন্দোলন সংগ্রামে স্বোচ্ছার ছিলেন তিনি। খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করতে সিলেটের রাজপথ কাঁপিয়েছেন।
পদত্যাগকালে তিনি বলেন, দলে কোনো দিন পদ-পদবির আশা করিনি। কিন্তু নেতাকর্মীর যারা রাজপথে জীবন বাজি রেখেছে। দলের কমিটিতে তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি।

তিনি বলেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃবৃন্দের উপর যে অন্যায় করা হয়েছে। আগে যুবদলের উপর অন্যায় করা হয়েছিল। আমরা পদত্যাগ করেছিলাম। আমাদের আশ্বাস দিয়ে ৭ দিনের মধ্যে ফায়সালা দেবার কথা বলেছিলেন মহাসচিব। আজ বছর চলে গেছে। উনার কথা শূণ্যে মিলিয়ে গেছে। কিন্তু এখন স্বেচ্ছাসেবক দলের যেসব নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, যাদেরকে অপমানিত করা হয়েছে, লাঞ্ছিত করা হয়েছে পদ-পদবি না দিয়ে, তারপর আমি যদি স্বপদে থাকি, এটা অন্যায় এবং জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার স্বার্থের রাজনীতির পরিপন্থী হবে।
সামসুজ্জামান বলেন, ‘নেতাকর্মীর স্বার্থে আমি আজ থেকে বিএনপি ছেড়ে দিলাম। বিএনপির কোনো দায়বদ্ধতা আমার উপর রইল না। তবে ব্যক্তিগত কোনো কারণে বিএনপি ছাড়িনি। দলে ইনসাফ বহি:র্ভূত কাজ কারবার দেখে স্বেচ্ছায়-স্বজ্ঞানে পদত্যাগ করছি।সারা বাংলাদেশে তৃণমূল নেতাকর্মীর পক্ষে কোনো না কোনো স্থান থেকে আওয়াজ উঠতে হবে। সেটা শাহজালালের পূণ্যভূমি থেকে শুরু হলো।
বাংলাদেশের প্রত্যেকটা জায়গায় যারা আমাদের মতো ত্যাগ স্বীকার করেছেন।তাদের বেঁছে বেঁছে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটা কিসের আলামত? প্রশ্ন রেখে সামসুজ্জামান বলেন, আমরা দলের আদর্শের জন্য রাজপথে ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন করেছিলাম। আর কেউ যখন রিস্ক নেবে না, আমি না হয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকলাম। নেতাকর্মীরা কেন রিস্ক নেবে? আন্দোলন করতে গিয়ে আমাদের সংসার চলে গেছে। সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য চলে গেছে। মরিচিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা শেষ হয়ে গেছি। অন্ধকার ঘরে আমরা কালো বিড়াল খুঁজেছি।
তিনি বলেন, একদল লোক খালেদা জিয়ার মৃত্যুর অপেক্ষা করছে।আমরা রাস্তা থেকে উঠে আসিনি।সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেও শুধুমাত্র ভালবেসে রাজনীতি করেছি। হালুয়া-রুটি খাওয়ার জন্য এখানে আসিনি। অথচ বিএনপি ক্ষমতায় থাকাবস্থায়ও ৪ বার জেল খেটেছি। আর আওয়ামী লীগের সময়তো বললামইনা। বিএনপির এই অবস্থায় তৃণমূল থেকে যদি আওয়াজ না উঠে। যদি খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়ে যায়, তবে পদ দিয়ে কি করবো? আজ যারা দল চালাচ্ছেন (হাইকমাণ্ড)। আমি জানিনা হাই কমাণ্ড কাকে বলে? আমি সংবিধান বুঝি। হাই কমান্ড বুঝি না এই কারণে, এটা রাজনৈতিক দল। হাইকমান্ড শব্দ অন্যান্য অপরাধী সংগঠনে ব্যবহৃত হয়। অনেক ক্ষুভ থেকে আজ পদত্যাগ করছি।
তৃণমূলকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, যদি দলকে বাঁচাতে চান, সত্যিকার অর্থে শহিদ জিয়ার সৈনিক হয়ে থাকেন, খালেদা জিয়াকে মা সম্বোধন করে ভালবেসে থাকেন। তাহলে সব কিছু জলাঞ্জলী দেবো। যে নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তির কথা বলে না, আপনারা ভুল জায়গায় রাজনীতি করছেন। আর যেসব ট্রেইলার বা ব্যবসায়ী রাজনীতি করবে, তারা আপনাদের কিনে নিবে, নেতাকর্মীদের কিনে নিয়ে রাজনীতির নামে ব্যবসা করবে।
তিনি বলেন, আমি যা করেছি। আমার কর্মীদের স্বার্থে করেছি। যারা মূল্যায়ন পায়নি, তাদের জন্য যদি ভূমিকা না রাখি, তাহলে হিপক্রেসি হিসেবে আখ্যায়িত হবো।

অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান বলেন, তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। যাকে আপনারা মা সম্বোধন করেন।তাঁকে কারাগারে রেখে স্যুট-টাই, নতুন জামা পরে ঘুরেছেন। লজ্জা লাগেনা আপনাদের। আপনাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। নেতারা কেবল অনর্থক উৎসব অনুষ্ঠানে গেছেন। কোথায় ছিল খালেদা জিয়া মুক্তির আন্দোলন? আমি কথা বলছি, আমাকে শোকজ করে দেওয়া হবে। অথচ আমরা বার বার অপশক্তির মোকাবেলা করেছি। কারো রক্তচক্ষুর ভয় করিনি, করবো না।
তিনি বলেন, যারা বিএনপি করে টাকা বানিয়েছিলেন, তারা চাইলে করোনার এই সময়ে মানুষের জীবন রক্ষায় একশত অক্সিজেন সিলিন্ডার দিতে পারতেন। কোটি টাকা সরকারের কোষাগারে দিতে পারতেন। সরকার না নিলে সেটাতো দেখার বিষয় ছিল।
অ্যাডভোকেট জামান ব্যথিত চিত্তে দলের মহাসচিবের কাছে প্রশ্ন রাখেন- দলে নেতৃত্ব পেতে হলে যোগ্যতার মাপকাঠি কি? ত্যাগ শিকার করে যারা যারা দলকে ভালবেসে তিল তিল করে বিনির্মাণ করেছেন তারাই আজ সেই দলে অনাহুত। বরং লবিং-তদবির অথবা বিশেষ ব্যবস্থায় সবকিছু হাসিল কারিদেরই দলে কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়।
তিনি নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা প্রায়শই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেন, রাষ্ট্রের কাছে ন্যায় ইনসাফের দাবি তুলেন, কিন্তু নিজের অন্তর আত্মাকে একবারও জিজ্ঞেস করে দেখবেন, আপনারা নিজেদের কর্মীদের বেলায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন কি? আজকে সহযোদ্ধাদের প্রতি যে অন্যায় আচরণ প্রদর্শন করা হয়েছে অবশ্যই ‘প্রকৃতি’এর প্রতিবিধান করবে। তাই যারা রাজনীতি ছাড়তে চায়, তাদের ছাড়তে দেবেন।

১৯৮৫ সালে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপির দুর্দিনে এদলকে প্রতিষ্ঠা করতে জীবনের সোনালী সময়, অর্থবিত্ত ব্যয় করেছেন। সীমাহীন প্রতিকূলতার মাঝেও দলকে প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করেছেন। কিন্তু কখনও হালুয়া রুটির ভাগ নেননি, কিংবা অনৈতিক কোন সুবিধাও গ্রহণ করেননি। উল্টো বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে চারবার কারাবরণ করতে হয়েছে তাকে।
তিনি তার রাজনৈতিক জীবনের ৩৬ বছর দলের জন্য সাদকা হিসেবে দান করে দিয়েছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি এখন থেকে বিএনপির সাথে তার আর কোন সম্পৃক্ততা রইলনা বলেও উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট জামানের অনুসারী শতাধিক নেতাকর্মী বক্তব্যের সঙ্গে স্লোগান দিয়ে একাত্ব পোষণ করেন। যদিও অ্যাডভোকেট জামান তার বক্তব্যে বলেন, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে কেউ একমত হতে পারেন, আবার নাও হতে পারেন। কোন ভয় থেকে নয়, বরং নিজ ইচ্ছাতেই দল থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



