বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকাণ্ড চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের একটি কন্টেইনার ডিপোতে ঘটলেও এতে যেন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে কাছের দুটি ফায়ার স্টেশন। সীতাকুণ্ডে কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের ৯ সদস্য নিহত হয়েছেন।
শনিবার রাত নটার দিকে চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩০ কিলোমিটারের মতো দূরে সীতাকুণ্ডের কদমরসুল এলাকায় কন্টেইনার টার্মিনালে যখন অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় তখন সে আগুন নেভাতে একদম শুরুতে গিয়েছিলেন সীতাকুণ্ড এবং কুমিরা ফায়ার স্টেশনের দমকল কর্মীরা।
আগুন প্রায় নিভিয়ে ফেলেছিলেন তারা। কিন্তু ঠিক ৪০ মিনিটের মাথায় ঘটে একের পর এক বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে পাঁচ কিলোমিটার দুর থেকেও শব্দ শোনা গেছে, কম্পন অনুভূত হয়েছে।
বিস্ফোরণে ডিপোতে থাকা মালবাহী কন্টেইনারগুলো দুমড়ে মুচড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। পরপর বেশ ক’টি বিস্ফোরণ হয়েছে। মৃত, নিখোঁজ এবং গুরুতর আহত সবাই সীতাকুণ্ড এবং কুমিরা ফায়ার স্টেশনের কর্মী।
সংস্থাটির সিনিয়র স্টাফ অফিসার এবং মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত মোঃ শাহজাহান শিকদার জানিয়েছেন, ১৯৮১ সালে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স পূর্ণগঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১৭ জন দমকল কর্মী মারা গেছেন। বাংলাদেশে একসাথে এতজন দমকল কর্মীর প্রাণহানি আর কখনোই ঘটেনি।
শনিবার অগ্নিকাণ্ডে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ১৫ জন। এদের মধ্যে দুজনকে সন্ধ্যায় এয়ার এম্বুলেন্সে ঢাকায় নেয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে রেখে তাদের চিকিৎস দেয়া হবে। আর বাকিরা চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচে) চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর বাইরে আরও কয়েকজন ফাইটারের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
নিহতদের মধ্যে ৮ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- কুমিরা ফায়ার স্টেশনের ফায়ার ফাইটার মো. রানা মিয়া। একই স্টেশনের নার্সিং অ্যাটেনডেন্ট মনিরুজ্জামান, ফায়ার ফাইটার আলাউদ্দিন, ফায়ার ফাইটার মো. শাকিল তরফদার, লিডার মিঠু দেওয়ান, সীতাকুণ্ড ফায়ার স্টেশনের লিডার নিপন চাকমা, ফায়ার ফাইটার রমজানুল ইসলাম, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
নিখোঁজরা হলেন- কুমিরা ফায়ার স্টেশনের লিডার মো. ইমরান হোসেন, ফায়ার ফাইটার শফিউল ইসলাম, সীতাকুণ্ড ফায়ার স্টেশনের ফায়ার ফাইটার রবিউল ইসলাম, ফরিদুজ্জামান।
ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ৭ সদস্যর ওই কমিটি: এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৭ সদস্যর ওই কমিটির প্রধান করা হয়েছে পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল মো. রেজাউল করিমকে। সদস্য সচিব করা হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-পরিচালক মো. আনিসুর রহমানকে। এছাড়া কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন- ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স টিসি’র উপাধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম জোন-১ এর উপ-সহকারী পরিচালক, শামস্ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স টিসি’র প্রশিক্ষক শামস আরমান, সাভারের ইপিজেডের সিনিয়র স্টেশন অফিসার জহিরুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম-৪৯ ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর ওমর ফারুক ভূঁইয়া।
নিহত ফায়ার ফাইটার মো. আলাউদ্দিনের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডে। বাবা আব্দুর রশিদ ছিলেন সাবেক ওয়ার্ড সদস্য। রশিদের সন্তানদের মধ্যে আলাউদ্দিন সেজো ছিলেন। তার মৃত্যুতে পরিবার পরিজনসহ গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। কেউ তার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। ঘরে তার ৩ বছরের ছেলে সন্তানও রয়েছে।
সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় মা মমতাজ বেগম। আদরের সন্তানকে হারিয়ে শোকে কাতর হয়ে পড়েছেন। আলাউদ্দিনের বড় ভাই নাসির উদ্দীন বলেন, আগুন লাগার পর প্রথম ইউনিটের সদস্য হিসেবে আগুন নেভাতে গিয়েছিল। এরপর বিস্ফোরণের সময় থেকে নিখোঁজ ছিল। নিহত আরেক ফায়ার ফাইটার মিঠু দেওয়ানের বাড়ি রাঙ্গামাটিতে। তিনি ফায়ার সার্ভিস কুমিরা শাখায় লিডার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মিঠু দেওয়ানের ভাই টিটু দেওয়ান বলেন, ফায়ার সার্ভিস অফিস থেকে খবর দেয়ার পর সকালে আমার ছোট ভাই ও খালা চট্টগ্রাম মেডিকেলে গেছেন।
ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য আমাকে একটি ছবি পাঠিয়েছে, আমি বলেছি এটাই আমার ভাই। হাসপাতালে যাওয়া আমার ছোট ভাইও তাকে শনাক্ত করতে পেরেছে। পরবর্তী কার্যক্রম শেষে তাকে রাঙ্গামাটি নিয়ে আসা হবে। এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিপন চাকমা নামে রাঙ্গামাটির আরও এক দমকলকর্মীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়ার পর থেকে তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারেননি সহকর্মীরা।
মেয়ের মুখ না দেখেই মারা গেলেন মনিরুজ্জামান: মাত্র ৭ দিন আগে কন্যা সন্তানের বাবা হয়েছিলেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্য মো. মনিরুজ্জামান। ছুটি নিয়ে শিগগিরই মেয়েকে দেখতে আসার কথা ছিল। কিন্তু মেয়ের মুখ না দেখেই তাকে বিদায় নিতে হয়েছে। গত শনিবার রাতে সীতাকুণ্ডে কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান চট্টগ্রামের কুমিরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে নার্সিং অ্যাডেনটেন্ট মনিরুজ্জামান (৩২)। তার বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের নাইয়ারা গ্রামে। বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক। তিনি বিয়ে করেছেন বরিশালে। স্ত্রী বাবার বাড়িতেই কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। এটিই তাদের প্রথম সন্তান।
কন্যা সন্তান চাইতেন ইমরান হোসেন মজুমদার
কুমিরা ফায়ার স্টেশনের মোট দমকল কর্মী ১৫ জন। কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এই স্টেশনের এখনো পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে দমকল বাহিনী।
গুরুতর আহত হয়েছেন সাতজন। শনিবার যে দলটি প্রথম কুমিরা থেকে কন্টেইনার টার্মিনালের আগুন নেভাতে গিয়েছিলেন তাদের দলনেতা ছিলেন ইমরান হোসেন মজুমদার। শনিবার বিস্ফোরণের পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। সোমবার দুপুরের পর তার মরদেহ শনাক্ত হয়েছে।
ইমরান হোসেন মজুমদারের স্ত্রী এখন ছয় মাসের গর্ভবতী। দুই সন্তানের মধ্যে বড় নয় বছর বয়সী একটি ছেলে। পাঁচ বয়সী একটি প্রতিবন্ধী কন্যা সন্তান রয়েছে তাদের যার মস্তিষ্ক স্বাভাবিকের চেয়ে আকারে ছোট। ইমরান হোসেন মজুমদারের ভাগ্নি সুমাইয়া আক্তারের সাথে কথা হচ্ছিল।
তিনি জানিয়েছেন, “ওনাদের প্রথম একটা মেয়ে বাচ্চা হয়েছিল যে তিন বছর বয়সে একই অসুখে মারা যায়। আমার মামা খুব মেয়ে বাচ্চা পছন্দ করতেন। মামী যখন প্রথম প্রেগন্যান্ট হন তখন বাচ্চা ছেলে না মেয়ে হবে তা না জেনেও দোকানে গিয়ে মেয়ে বাচ্চাদের কাপড় দেখতেন মামা। পরেরটাও যেন মেয়ে হয় সেটা চাইতেন।”bচাঁদপুরের কচুয়ার বাসিন্দা ইমরান হোসেন মজুমদার দমকল বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন ২০০১ সালে।
প্রেম করে বিয়ে, ছয় মাসের মাথায় মৃত্যু
বাংলাদেশে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা, দুর্যোগে সবচেয়ে প্রথম যে বাহিনী সাড়া দেয় সেটি হল বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। সে হোক ভবন ধস, লঞ্চ ডুবি অথবা অগ্নিকাণ্ড।
বাংলাদেশের একমাত্র উদ্ধারকারী সংস্থা এটি। শনিবার কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে যেসব দমকল কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন শেরপুরের বাসিন্দা রমজানুল ইসলামের বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর। বছর দুই আগে দমকল বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
তার স্ত্রী সাদিয়া আফরিন বলছিলেন, “ও খুব ঘুরতে ভালবাসত। নুডলস খেতে ভালবাসত।” মাস ছয়েক আগে বিয়ে করেছেন দু’জনে। তার আগে পড়াশুনা চলাকালীন প্রেম করেছেন চার বছর। কিন্তু বিয়ের পর দুজনে একসাথে সংসার করতে পেরেছেন মাত্র একমাস।
সাদিয়া আফরিন বলছিলেন, “আমি শেরপুরে কৃষি ডিপ্লোমাতে পড়তাম আর ও পলিটেকনিকে পড়তো। ওরে দেখার পরই আমার ভালো লাগছিল। পরে পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পর থেকে ও সীতাকুণ্ডে থাকতো আর আমি শেরপুর। গতমাসের চার তারিখ কেবল বাসা ভাড়া করে আমাকে নিয়ে আসছিল। মাত্র একমাস। তারপর ও নাই হয়ে গেল।”
ছুটি থেকে মাত্র ফিরেই মৃত্যুর মুখে
একসাথে এত সহকর্মীর মৃত্যুতে বিহ্বল হয়ে পড়েছেন সীতাকুণ্ড ও কুমিরা ফায়ার স্টেশনের যে কয়জন বেঁচে আছেন তারা। শোকের সুযোগও তারা পাচ্ছেন না। অগ্নি নির্বাপণের কাজ করে যেতে হচ্ছে। আর আহতরা হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন।
কুমিরা ফায়ার স্টেশনের দুইজন দলনেতার একজন আতিকুর রহমান বলছিলেন মৃত অপর দলনেতা মিঠু দেওয়ান সম্পর্কে।
“রাঙামাটিতে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল। মাত্র শুক্রবারই ফিরে এসেছে। ছুটির পর এটাই ছিল প্রথম ফায়ার রেসপন্স। রাঙামাটির আনারস খুব ভাল হয়। আমাদের সবার জন্য আনারস নিয়ে আসছিল। ওই দিন আগুন নেভাতে আমাদের স্টেশনের টিম লিডার হিসেবে গিয়েছিলেন। ছুটি থেকে এসেই এইভাবে মারা গেল।” মিঠু দেওয়ান দলনেতা ছিলেন।
এই ফায়ার স্টেশনে বাকি যারা কাজ করতেন তাদের সবার বয়স ২৫ এর নিচে। বেশিরভাগের দমকল কর্মী হিসেবে চাকরির বয়স দুই থেকে তিন বছর।
“এরা সবাই আমার ছেলের মতো ছিল। এত কম বয়স। এদের নিয়ে কথা বলতে গেলেই আমার কান্না পাচ্ছে। আমার পুরো স্টেশন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। একটা ভালো কাজ করতে গিয়ে ওরা আত্মাহুতি দিয়েছে। এইটুকু ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা চেষ্টা করছি।”, বলছিলেন আতিকুর রহমান।
যেভাবে বেঁচে গেলেন মোঃ নুর ইসলাম
“আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে আমি বেঁচে গেছি”, বলছিলেন সীতাকুণ্ড ফায়ার স্টেশনের দমকল কর্মী মোঃ নুর ইসলাম।
“অন্যরা আগুন নেভাচ্ছিল। আমি রোগী আনা নেয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের কাছে ছিলাম। সেজন্য আমার প্রাণটা বেঁচে গেছে। এরপর সারারাত অ্যাম্বুলেন্সে করে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে গেছি। যাবার পথে কারো অক্সিজেন দরকার হয়েছে সেটা দিয়েছি। কারোর ব্যান্ডেজ লাগছে সেটা করেছি। কিন্তু মাথার মধ্যে খালি ঘুরছিল, এটা কি হল, এটা কি হল?”
চোখের সামনে এতজন সহকর্মীর মৃত্যুর পরও তাকে দায়িত্ব পালন করে যেতে হয়েছে। যাদের সাথে দিন রাত কাটিয়েছেন তাদের জন্য শোকের সময় পাননি। আজও কাজ করছেন তিনি। দমকল কর্মীদের এমনই জীবন। সুত্র: বিবিসি বাংলা
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



