সিলেটের ১৩০৭ বিদ্যালয়ে নেই শহীদ মিনার!
নতুন সিলেট প্রতিবেদক:স্বাধিকার আন্দোলনের সূঁতিকাগার ভাষা আন্দোলন। ভাষা শহীদদের স্মরণের স্মৃতিচিহ্ন শহীদ মিনার। অথচ শহীদ স্মৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া থেকে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা। সিলেটের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠেনি শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন। ফলে চেতনার উৎস ভাষা শহীদদের স্মৃতির পরিচয় থেকে পিছিয়ে সিলেটের শিশুরা।
সিলেটের বেশিরভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শহীদ মিনার নেই বললেই চলে। সিটি কর্পোরেশন ও জেলায় প্রায় ১৫শ বিদ্যালয় থাকলেও শহীদ মিনার আছে মাত্র ১৯৩টিতে। এর সিংহভাগই পশ্চাদপদ উপজেলা হিসেবে পরিচিত সিলেটের কানাইঘাটে। জেলার জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাটের কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনারই নেই। সংশ্লিষ্টরা এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন। শহীদমিনার না থাকা বা পিছিয়ে পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে খোঁড়াযুক্তি উপস্থাপন করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাঙালির আবেগ অনুভূতির কেন্দ্রস্থল শহীদ মিনার। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাক শাসকরা ভাষা শহীদদের মরদেহ ফেরত দেয়নি। নিজেরাই মাটিচাপা দিয়েছিল আজিমপুর গোরস্তানে। সেসময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনার নির্মাণের পর সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন,- এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে এক রাতের মধ্যেই প্রথম শহীদ মিনারটি বানিয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনে। পাকিরা বুলডোজার সেটিও গুড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাতে কি! এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের প্রায় সব জেলায়, এমনকি তৎকালীন অনেক থানা সদরেও নির্মাণ শুরু হয়েছিল ভাষা শহীদদের স্মৃতির মিনার।
আমাদের চেতনার উৎস ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখা ও সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউলদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি স্কুলে শহীদ মিনার তৈরির আহ্বান জানিয়েছিলেন।
পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলেও সরকারের নির্দেশনায় ছিল, স্কুল মেরামতের কাজের বরাদ্দ থেকে বেঁচে যাওয়া অর্থের সঙ্গে স্থানীয় দাতাদের উদ্বুদ্ধ করে যেনো কাজটি করা হয়। এই আহ্বানে খুব একটা সাঁড়া মিলেনি সিলেট অঞ্চলে।
এজন্য উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে স্থানীয় দাতাদের অনাগ্রহের অজুহাত তুলে ধরছেন। তাদের সেই অজুহাত যে কেবল খোঁড়াযুক্তি তারই প্রমাণ জেলার কানাইঘাট উপজেলা। সিলেট বিভাগের পশ্চাদপদ এলাকা হিসাবে পরিচিত এ উপজেলায় মোট ১৩০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯০টিতে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আর্থনৈতিকভাবে অনেকটা স্বচ্ছল সিলেট সদর উপজেলায় ১২৫ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৯টিতে শহীদ মিনার আছে। প্রথম শ্রেনীর উপজেলা খ্যাত গোলাপগঞ্জে ১৮০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শহীদ মিনার আছে ১৯টিতে, প্রবাসী অধ্যুষিত বিয়ানীবাজারের ১৫০টির বিদ্যালয়ের বিপরীতে ১০টিতে, বালাগঞ্জের ৭২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫টিতে, ওসমানীনগরের ১১০টির মধ্যে ১১টিতে শহীদ মিনার স্থাপিত আছে।
সবচেয়ে হতাশারজনক চিত্র পাথর কোয়ারি আর পর্যটনের জন্য বিখ্যাত গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরের কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনারই নেই। শহরতলী দক্ষিণ সুরমায় ১১৬টি বিদ্যালয়ের বিপরীতে শহীদ মিনার আছে মাত্র একটিতে। আর গোয়াইনঘাটে ১৩৬ ও জৈন্তাপুরে ৭২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও গড়ে ওঠেনি শহীদ স্মৃতি।
এছাড়া জকিগঞ্জে ২, কোম্পানীগঞ্জে ৯, ফেঞ্চুগঞ্জের ৫ ও বিশ্বনাথের ২০টি বিদ্যালয়ে আছে স্মৃতির মিনার। সংশ্লিষ্ট এসব উপজেলাগুলোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অনেকে মোবাইল ফোন রিসিভ না করায় মোট স্কুলের সংখ্যাটি জানা যায়নি।
প্রবাসী অধ্যুষিত অন্য উপজেলাগুলোকে পেছনে ফেলে শহীদমিনার নির্মাণের ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন প্রসঙ্গে কানাইঘাট উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস বাংলানিউজকে বলেন, সরকারের আহ্বানের কথা জানিয়ে স্কুলগুলোর ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে স্থানীয় প্রবাসী ও দাতাদের উদ্বুদ্ধ করেছি। এতেই তারা এগিয়ে এসেছেন। কৃতিত্বটা স্থানীয় ও প্রবাসী দাতাদের।
সিলেটের গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, বালাগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, দক্ষিণ সুরমা, ওসমানীনগর ও জৈন্তাপুরের উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা যথাক্রমে যথাক্রমে জহিরুল ইসলাম, রুমান মিয়া, আব্দুর রকিব ভুঁইয়া, মিষ্টার প্রতুল, আব্দুর রাজ্জাক ও মো. আব্দুল জলিল তালুকদার শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো বক্তব্য দিয়ে বলেন, গ্রামেগঞ্জের মানুষ শহীদ মিনার নিয়ে অতোটা আগ্রহী নয়।আর এখাতে নাকি সরকারি বরাদ্দও নেই। তবে তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কানাইঘাটের উদাহরণ টানতেই তাদের অনেকে বললেন- জ্বি, আমাদের চেষ্টারও ত্রুটি নেই।
এ বিষয়ে সিলেট জেলা শিক্ষা অফিসার বায়েজিদ খান বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমি বিভিন্ন জেলায় কাজ করেছি। কিন্তু সিলেটের মতো হতাশাজনক চিত্র কোথাও দেখিনি। সরকারের নির্দেশনা ছিল ব্যবস্থা কমিটির ও দাতাদের সহযোগীয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংস্কারের টাকা থেকে শহীদ মিনার করার। কিন্তু সিলেটের বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে তা অনুপস্থিত। অবশ্য প্রত্যেক বিদ্যালয়ে শহীদ করার ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



