সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার গুরমার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধটি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা। এ বাঁধের একদিকে বিশাল টাঙ্গুয়ার হাওর। ভারতের মেঘালয় থেকে সরকারি ঢলের পানি নামে এ হাওরে। যে কারণে বাঁধে পানির চাপ থাকে বেশি। এতে বাঁধের কয়েকটি অংশে ফাটল ও ধস দেখা দিয়েছে।
১০ দিন ধরে বাঁধের একদিকে সংস্কার করলে আবার ঢেউয়ে ফাটল বা ধস দেখা দেয় অন্যদিকে। এতে বাঁধটি রক্ষায় ঘুম হারাম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। গতকাল বুধবার বিকেলেও হাওরের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এলাকার বাঁধে নতুন করে ধস দেখা দিয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ হাওরে তাহিরপুরের শ্রীপুর উত্তর ও দক্ষিণ এবং ধর্মপাশা উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের মানুষের অন্তত ছয় হাজার হেক্টর জমি আছে। এখন জেলার হাওরগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে। যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে ঢলের পানিতে তলিয়ে যেতে পারে সব বোরো ধান।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, এ বাঁধ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দিনরাত প্রশাসন ও পাউবো কর্মকর্তারা এখানে শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করছেন। রাতে বাঁধে অবস্থান করে কাজ তদারকি করছেন তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রায়হান কবির। কিন্তু ঝুঁকি কমার বদলে বাড়ছে। বাঁধের বাগমারা এলাকায় গত মঙ্গলবার ধস দেখা দেয়। বুধবার ধস দেখা দিয়েছে হাওরের গোলাবাড়ির কাছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরপারের গোলাবাড়ি এলাকার কৃষক খসরুল আলম বলেন, ‘হাওরে পানির চাপ বেশি। যে কারণে বাঁধটি ঠেকানো কষ্ট হচ্ছে। প্রশাসনের লোকজন রাতে এখানে নৌকায় থাকেন। ইউএনও সাবও থাকছেন। সবাই মিলেই চেষ্টা করতাছেন। কিন্তু যে পরিস্থিতি, শেষ রক্ষা না–ও হতে পারে।’
জেলায় ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৩ মিলিমিটার। দু-এক দিনের মধ্যে ভারী বৃষ্টি হবে, আবার উজানের ঢল নামবে। তাই হাওরের ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই সেগুলো দ্রুত কেটে তোলার অনুরোধ জানানো হচ্ছে কৃষকদের।
তাহিরপুর উপজেলার দায়িত্বে থাকা পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এই হাওর নিয়ে আমাদের ঘুম নেই। সবাই অস্থির। আসলে ঢল এসে এখানেই প্রথমে আঘাত হানে। দেখা গেছে, বাঁধের এক পাশে পানির প্রচণ্ড চাপ, আবার উল্টো পাশে ২০ ফুট নিচে পানি। এ কারণেই মাটি নরম হয়ে ধস দেখা দিচ্ছে। তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
শুধু এ হাওরের বাঁধ নয়, কমবেশি ঝুঁকিতে আছে এই উপজেলার মাটিয়ার হাওরের পাটাবুকা, আনন্দপুর ও ছিলান তাহিরপুর এলাকার বাঁধ; শনির হাওরের জামালগঞ্জ অংশের নান্টুখালি, ঝালখালি ও লালুর গোয়ালা বাঁধ; দিরাই উপজেলার বরাম হাওরের তুফানখালি, কাদিরপুরের বাঁধ; ধরমপাশা উপজেলার শালদিঘা এলাকার বাঁধ; শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরের মোহনখল্লী এলাকার ফসল রক্ষা বাঁধ। এগুলোতে প্রশাসন ও পাউবো কর্মকর্তাদের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলায় উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানির চাপে ভেঙে যাওয়া ডোবাইল ফসলরক্ষা বাঁধটিতে বাঁশ ও বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে মেরামত কাজ চলছে। বুধবার সকালে
সুনামগঞ্জ পাউবো সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৩ মিলিমিটার। দু-এক দিনের মধ্যে ভারী বৃষ্টি হবে, আবার উজানের ঢল নামবে। তাই হাওরের ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই সেগুলো দ্রুত কেটে তোলার অনুরোধ জানানো হচ্ছে কৃষকদের। বিষয়টি প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে, কৃষি বিভাগের লোকজন ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। গতকাল বুধবারও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা খরচার হাওর ও আঙ্গারুলি হাওর এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে।
বিশ্বম্ভরপুর ইউএনও সাদি উর রহিম জাদিদ বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তাঁরা পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে একরকম লড়াই করে ফসল রক্ষা বাঁধগুলো টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু এখন আবার ঢল নামলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। কৃষকেরা ধান কাটছেন। একই সঙ্গে কৃষি বিভাগের লোকজন ২৯টি কম্বাইন্ড হার্ভেস্টর ও রিপার নিয়ে মাঠে মাঠে আছেন।
পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ১৫ থেকে ১৭ এপ্রিল—এই তিন দিন সুনামগঞ্জে ও ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে নামবে পাহাড়ি ঢল। ফলে দ্রুত নদ-নদীর পানির বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।
গত ৩০ মার্চ থেকে ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জি থেকে নামা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জে অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে জেলার সব হাওরের বোরো ফসল। ২ এপ্রিল প্রথমে তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরের একটি বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়। এরপর একে একে ছোট–বড় আরও ১০টি হাওরের ফসলহানি ঘটেছে। তবে জেলার বড় হাওরগুলোর ফসলের এখনো ক্ষতি হয়নি।
জেলা কৃষি বিভাগের হিসাবমতে, এবার সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ৫০ হাজার ২২০ মেট্রিক টন। এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৬৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



