সকাল ১০টা। নগরীর ২নং ওয়ার্ডের মির্জা জাঙ্গাল মণিপুরী রাজবাড়ি পয়েন্ট। মানুষের জটলা। হাতে টিসিবি’র পণ্য কেনার টোকেন। পুরুষ-মহিলা দল বেঁধে অপেক্ষা। ট্রাক আসবে, কম মূল্যে পণ্য কিনে বাড়ি যাবেন। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে গেলেও ট্রাকের দেখা নেই। ডিলার বিজয় চক্রবর্তী।
ফোনে যোগাযোগ করা হলে জানালেন; ‘ব্যাংকে আছি। চালান জমা দিয়ে পণ্য আনতে যাবো।’ বিকাল তখন ৩টা। ফের ফোন করা হলে জানালেন, ‘গুদামে আছি। পণ্য লোড হচ্ছে। এরপর আসবো।’ যোগাযোগ করা হলে ওয়ার্ড কাউন্সিলর বিক্রম কর সম্রাটও হতাশা ব্যক্ত করলেন। জানালেন, ‘সকালের দিকে পণ্য কিনতে অনেকেই এসেছিলেন। ট্রাক না আসায় চলে গেছেন। এখন ট্রাক আসবে শুনছি। আমরা ফোনে ফোনে ক্রেতাদের খবর পাঠাচ্ছি।’ ২নং ওয়ার্ডে আরেকজন ডিলার আছেন বিপ্লব পুরকায়স্থ। ওয়ার্ডের আব্দুর রহমান বিল্ডিংয়ের সামনে পণ্য বিক্রি করার কথা। কিন্তু তিনিও বিকালে পেলেন টিসিবির পণ্য। অথচ সরকারের বেঁধে দেয়া নিয়ম হচ্ছে; সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত পণ্য বিক্রি করা হবে। সকালে ট্রাক পৌঁছার কথা নির্ধারিত স্থানে। পণ্য বিক্রির তৃতীয় দিনের মাথায় কেন এমন হচ্ছে প্রশ্নের জবাবে ডিলাররা জানালেন, পণ্য বিক্রির আগের দিন দাপ্তরিক সব কাজ শেষ করে রাখার নিয়ম। পরদিন সকালে চালানপত্র দেখিয়ে গুদাম থেকে পণ্য নিয়ে বিক্রয়স্থলে যাওয়ার কথা। কিন্তু প্রক্রিয়াটা জটিল। এছাড়া- যেদিন পণ্য বিক্রি করা হবে সেইদিনই টাকা জমা দিয়ে পণ্য কিনে বিক্রয় স্থলে যেতে হচ্ছে। এতে করে সকাল থেকে দুপুর কখনো কখনো বিকাল পর্যন্ত সময় গুদামেই চলে যায়। এ কারণে বিকম্ব হচ্ছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে সকালে জানানো হয়, নগরীর ১নং ওয়ার্ডের আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে পণ্য বিক্রির সিডিউল রয়েছে। বেলা ১১টায় ওই এলাকায় সরেজমিন গিয়ে জানা গেল ওখানে টিসিবি’র ট্রাক আসেনি। কেউ বলতে পারে না টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করা হবে কিনা। ফোনে যোগাযোগ করা হলে ডিলার শহীদ আহমদ জানালেন তিনিও ব্যাংকে আছেন। চালান জমা দিতে গেছেন। এরপরও যাবেন ডিসি অফিসে। ওখান থেকে গুদামে গিয়ে পণ্য কিনে যাবেন বিক্রয়স্থল আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে। বিকালে ফোন করা হলে তিনি জানান, পণ্যের জন্য গুদামে আছেন। প্যাকেজিংয়ে বিলম্ব হচ্ছে। কাউন্সিলের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। তারা আজ সকালে পণ্য নিয়ে বিক্রয়স্থলে যাবেন। তার আগে সকালে কাউন্সিলরের পক্ষ থেকে এলাকাবাসীকে জানিয়ে দেয়া হবে। শহীদ আহমদ জানালেন, টিসিবির পণ্য কিনে আবার বিক্রি করতে হলে এক চালানের জন্য দুইদিনের ট্রাক ভাড়া লাগছে। এছাড়া, রাতের বেলা পণ্য নিজেদের সংগ্রহে রাখা কষ্টকর। সব মিলিয়ে পণ্য সংগ্রহ ও বিক্রি করতে তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ১৭নং ওয়ার্ডের কাজিটুলা এলাকা। কাউন্সিলরের বাসার সামনে টিসিবির পণ্য বিক্রি শুরু হয় সকাল ১০টা থেকে। শ’ শ’ মানুষের লাইন। কেউ সকাল ৮টা থেকে এসে বসে আছেন। পণ্য বিক্রি হচ্ছে ধীরগতিতে। এ কারণে ৩-৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করে পণ্য কিনতে হচ্ছে স্থানীয়দের। গতকাল সকাল থেকে প্রথমদিনের মতো ওই এলাকায় পণ্য বিক্রি শুরু হয়। স্থানীয় কাউন্সিলর রাশেদ আহমদ জানিয়েছেন, তার ওয়ার্ডে ২৬০০ জনের তালিকা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তিন পর মাত্র ৫০০ জন ক্রেতা পণ্য কিনতে পারবেন। ডিলারের কাছে অবশিষ্ট পণ্য নেই। যখন পণ্য পাওয়া যাবে তখন দেয়া হবে বলে জানান তিনি। ওই এলাকায় পণ্য বিক্রি করছে মেসার্স কিবরিয়া এন্টারপ্রাইজ। ডিলারের ব্যবস্থাপক মনোজ কুমার তালুকদার গতকাল বিকালে জানিয়েছেন, ‘আমরা তো পণ্য পাচ্ছি না। টাকার কোনো সমস্যা না। ২৬০০ ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছাতে হবে। কিন্তু প্যাকেজিংয়ে সমস্যা। বিশেষ করে ডাল ও চিনি প্যাকেজিং করেই আনতে হয়। গুদামে সেটি করা হয়। একদিকে প্যাকেজিং হয়, অন্যদিকে পণ্য ট্রাকে লোড করা হয়।’ তিনি জানান, ‘পণ্য প্যাকেজিং করা থাকলে কোনো সমস্যা হবে না। আমরা এনে বিক্রি করতে পারবো। এজন্য তিনি দ্রততম সময়ের মধ্যে পণ্য প্যাকেজিং করে রাখার দাবি জানান।’ কাজিটুলা এলাকায় টিসিবির পণ্য কিনতে আসা কয়েকজন গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, টিসিবির পণ্য বিক্রি শুরু হওয়ার তিনদিনের মাথায় তারা পণ্য পাচ্ছেন। বলা হচ্ছে মাত্র ৫০০ জন পাবেন। কিন্তু উপস্থিত আছেন হাজারেরও উপরে। এছাড়া চাল, পিয়াজসহ অন্য নিত্যপণ্য টিসিবিতে পাওয়া যাচ্ছে না। এতে দেখা যাচ্ছে- মাত্র তিনটি পদের পণ্য কিনতে দিন চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে দিন মজুররা কাজকর্ম রেখে এসে ঘন্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এজন্য তারা টোকেন সংগ্রহ, টাকা গ্রহণ এবং সিরিয়াল দ্রততম করার দাবি তোলেন। ১৮নং ওয়ার্ডের আগপাড়াস্থ কাউন্সিলর অফিসের সামনের মাঠে পণ্য বিক্রির কথা ছিল মঙ্গলবার। সকাল থেকে ছিল ট্রাকের অপেক্ষা। কিন্তু বিকাল পর্যন্ত ট্রাক আসেনি। কাউন্সিলর এবিএম জিল্লুর রহমান উজ্জ্বল জানিয়েছেন, ‘বুধবার সকালে ট্রাক আসার পর পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে। ডিলারদের পাশাপাশি স্থানীয়রা মানুষের কষ্ট লাঘবে কাজ করছেন।’ তিনি জানান, ‘তার ওয়ার্ডে কার্ডধারী অনেকেই এখনো পণ্য পাননি। বেশি পরিমাণ পণ্য নিয়ে এলে এই চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।’ এদিকে- টিসিবি’র পণ্য প্রাপ্তিতে বিলম্ব ও সার্বিক অব্যবস্থাপনার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এ,এইচ এম মাহফুজুর রহমান। তিনি দুপুরে জানিয়েছেন, ‘তার কাছে পণ্যর অভাব নেই। ডিলার চাহিদামতো পণ্য পাচ্ছেন। প্রথমদিকে প্যাকেজিংয়ে কিছুটা সমস্যা থাকলেও এখন আর নেই।’ তিনি ডিলারদের উপর পাল্টা অভিযোগ তোলেন। বলেন.‘অনেক ডিলারকে আমরা বেশি পরিমাণ পণ্য দিতে চাইলেও টাকার অভাব দেখিয়ে তারা পণ্য নিচ্ছেন না। চালানপত্র জমা দিয়ে যারাই পণ্যর জন্য গুদামে যাচ্ছেন তাদের স্বল্প সময়ের মধ্যে পণ্য দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।’ সিলেট জেলা ও নগরীর ৬২টি স্থানে টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করছে জেলা প্রশাসন। এজন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৯৭ জন ডিলার। এরমধ্যে ৩০ জন ডিলার সিলেট নগরীতে পণ্য বিক্রি করছেন। ১৩ উপজেলায় রয়েছেন ৬৭ জন ডিলার। মোট ১ লাখ ৮২ হাজার ৩৮২ জন কার্ডধারী গ্রাহকের কাছে এই পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। সিলেট নগরে এর সংখ্যা ৪৫ হাজার। আর ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৮২ জন বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা ন্যায্যমুল্যে পণ্য কেনার সুযোগ পাচ্ছেন।
সুত্র: মানবজমিন।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



