সিলেট: ক্লুলেস থেকে গেলো সিলেটের জৈন্তাপুর ঘাটেরচটি গ্রামে শম্ভু দেবনাথ হত্যাকাণ্ড। ঘটনার দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো অজানা হত্যার কারণ, অধরায় হত্যাকারীরা। পুলিশও উদঘাটন করতে পারিনি হত্যার রহস্য।
গত ৪ মার্চ নিখোঁজ হন সিলেটের কানাইঘাটের লামা ঝিঙ্গাবাড়ি গ্রামের শৈলেস চন্দ্র দেবনাথের ছেলে শম্ভু দেবনাথ (২৪)। তিনি সিলেটের বটেশ্বর সেনানীবাস সংলগ্ন সোয়াবহর গ্রামে নানার বাড়িতে খালা-খালুর সঙ্গে থাকতেন।
শম্ভু নিখোঁজের পরদিন ৫মার্চ ঘাটেরচটি গ্রামের বাচ্চু মিয়ার ছেলে রাজমিস্ত্রী ডালিম আহমদ (২২) নিখোঁজ হন। ৭মার্চ গ্রামের দেওচাপড়ার হাওরে মৎসখামারে মিলে শম্ভুর হাত-পা বাধা মরদেহ। মরদেহটি ডালিমের ভেবে দাফন করা হয়। ৮ মার্চ মাটি চাপা অবস্থায় ডালিমের মরদেহ উদ্ধারের পর জানা গেলো আগে দাফন করা মরদেহটি শম্ভুর-ই ছিল।
উভয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অনুসন্ধানে নামে বাংলানিউজ। এরইমধ্যে ডালিম হত্যাকাণ্ডের কারণ উন্মোচন করলেও শম্ভু দেবনাথ হত্যার কারণ অজানা থেকে যায়।
সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে নিহতের স্বজন এবং এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা হয়। হত্যার নেপথ্যে কোনো প্রেম-পরকীয়া, ঝগড়া, পূর্ব শত্রুতা, আর্থিক লেনদেন, মাদকের সংশ্লিষ্টতা, জমিজমা নিয়ে বিরোধ এমনকি যে পরিবারে শম্ভু বড় হয়েছেন, সেই পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি আছে কিনা খতিয়ে দেখা হয়।

নিহত শম্ভু দেবনাথের খালা-খালু। ইনসেটে শম্ভু দেবনাথ। ছবি-নতুন সিলেট
স্বজন ও এলাকার মানুষের বক্তব্যে, শম্ভু দেবনাথের ক্ষুদে ব্যবসা করতেন বটেশ্বর সিনেমা হল সংলগ্ন। যতবার গ্রামের বাড়ি কানাইঘাটে গেছেন ততবার দোকান চুরি হয়েছে। খালার বাড়ির কাঁচা বসত ঘরটিতেও চুরি সংঘটিত হয়। তাতে ঘুরে ফিরে শম্ভুর নানা বাড়ির জায়গা নিয়ে বিরোধ সামনে উঠে আসে। যে বিরোধ চলে আসছে আগে থেকেই।
জানা গেছে, নিরীহ পরিবার হিসেবে সোয়াবহর গ্রামের প্রমোদ চন্দ্র নাথের ৭১ শতক ভূমি গ্রাস করে নিতে আগে থেকেই ভূমিখেকোদের লুলুপ দৃষ্টি ছিল। ওই ভূমি থেকে তাদের উচ্ছেদ করে দিতে পারলেই যেনো একটি বিশেষ মহলের ফায়দা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত ২০০০ সালের ১০ মে নিখোঁজ হন সোয়াবহর গ্রামের প্রমোদ চন্দ্র নাথের একমাত্র ছেলে শম্ভুর মামা প্রল্লাদ চন্দ্র নাথ শঙ্কর (২৬)। তার কোনো হদিস মিলেনি আজো। স্বজনদের কাছে তিনি নিখোঁজ থেকে গেছেন। আর মামার পথেই এবার ভাগ্নে নিখোঁজ, ব্যতিক্রম কেবল তার মরদেহ পাওয়া গেছে।
ছেলে হারানোর শোকে কাতর প্রমোদ চন্দ্র নাথ নি:সঙ্গ জীবনে কাটাতেন। মাত্র ৯ বছর বয়সে শম্ভুকে তার কাছে নিয়ে আসেন। মৃত্যুর আগে সম্পত্তি তিন মেয়ের নামে লিখে দেন। বর্তমানে ওই সম্পত্তির ৩৫ শতক দখলে। অবশিষ্ট সম্পত্তি বেদখল। এলাকার জামাল ওরফে হাঁতুড়ি জামালের নেতৃত্বে একটি চক্র দখল করে নিয়েছে। এ নিয়ে মামলাও চলছে আদালতে। বর্তমানে জমির বাজার মূল্য শতক প্রায় ৫/৬ লাখ টাকা। প্রমোদ চন্দ্রের তিন মেয়ের পক্ষে মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন শম্ভুর খালার স্বামী বরদা দেবনাথ।
শম্ভু দেবনাথ কলেজে এইচএসসিতে অধ্যয়নরত ছিলেন। থাকতেন নানার রেখে যাওয়া ভিটভূমিতে মেঝো খালা ও তার স্বামী পরিমল দেবনাথের পরিবারের সঙ্গে। ভূমি মূল্যবান হলেও কাঁচা ঘরে বসবাস তাদের। বাবার দেওয়া সম্পত্তির এক শতকও বিক্রি করেননি তারা। তারপরও ভূমির দখল কিভাবে নেওয়া হলো, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ওই পরিবারে আরও আছেন পরিমল দেবের দশম শ্রেনী পড়ুয়া মেয়ে ও স্কুল পড়ুয়া ২ ছেলে।পেশায় বেত ব্যবসায়ী পরিমলের পরিবার দেখাশোনা করতেন শম্ভু। পড়ালেখার পাশাপাশি বটেশ্বর বাজারে ফ্ল্যাক্সি ও চায়ের দোকান চালাতেন। মূলত; সম্পত্তি ও পরিবারের ঢাল হয়েছিলেন শম্ভু দেবনাথ। অবশেষে মামার মতো তাকে নিখোঁজ হতে হলো।
শম্ভুর বাবা শৈলেস দেবনাথ ও মা লুকুছ রানী দেবনাথ বলেন, শম্ভুর দোকান বেশ কয়েকবার চুরি হয়েছে। সে বাড়িতে আসলেই দোকান চুরি হতো।
মা লুকুছ রানী বলেন, তার বাবার জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এই বিরোধে ভাই হারিয়েছেন। এবার ছেলেকেও হারালেন।জমি নিয়ে বিরোধ থেকে তার ছেলেকে হত্যা করা হতে পারে।হত্যাকারীদের ফাঁসি চান তিনি।
নিহতের ভাই শম্ভু হত্যা মামলার বাদি সত্যানন্দ দেবনাথ বলেন, তারা ৪ ভাইয়ের মধ্যে শম্ভুর অবস্থান ৩ নম্বর। সে নানা বাড়িতে বড় হয়েছে। মামা নিখোঁজ হয়েছেন প্রায় ২২ বছর আগে। তবে ভাইয়ের হত্যার জন্য নির্দিষ্টভাবে কাউকে দায়ী না করলেও জায়গার বিরোধকে বড় করে দেখছেন।
নিহত শম্ভুর খালু পরিমল দেবনাথ বলেন, শম্ভু নিখোঁজের ১০/১২দিন আগে থেকে তিনি সুনামগঞ্জের দিরাই ছিলেন। সেখানে থেকে বেতের ব্যবসা্ করেন। খবর পেয়ে ৫মার্চ বাড়িতে আসেন এবং থানায় জিডি করেন। যেদিন হাওরে অজ্ঞাত মরদেহ মিলে। সেদিন তিনিও ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু লোকজনের ভীড় বেশি হওয়া পুলিশ তাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া ডালিমের পরিবার মরদেহ সনাক্ত করেছে, তাই ফিরে আসেন। পরবর্তীতে ডালিমের মরদেহ উদ্ধারের পর জানতে পারেন, হাওর থেকে উদ্ধারকৃত মৃতদেহটি শম্ভুরই ছিল।
তিনি বলেন, ৪ মার্চ সকাল ৮টার দিকে গরু হাওরে দিয়ে ঘাস কাটতে যাওয়ার কথা ছিল শম্ভুর। সে প্রায় দিনই গরুর জন্য ঘাস কেটে আনতে যায়। এলাকার সবাই তাকে আমার সন্তান হিসেবেই জানতো। তার কোনো বাজে অভ্যাসও ছিল না। কে বা কারা তাকে হত্যা করলো, তাও তিনি জানেন না। তবে ভূমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে, মামলাও চলছে।
এদিকে, শম্ভু দেবনাথ হত্যার ঘটনায় বেশ কিছু কারণ সামনে নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ঘটনার পর পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দিয়ে ২টি টিম বানিয়ে দিয়েছেন ঘটনার তদন্তে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্লু উদঘাটনে ডিবির টিমও কাজ করছে। কিন্তু এখনো কোনো কিনারা করা সম্ভব হয়নি।
সিলেটের অতিরিক্ত সুপার (মিডিয়া) মো. লুৎফর রহমান বলেন, শম্ভু হত্যার রহস্য বের করতে নির্দিষ্ট কিছু কারণ সামনে রেখে তদন্ত চলছে।হত্যাকারী কারা অচিরেই খোঁজে বের করা হবে।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



