ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে সিলেটে ভোজ্য তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরী করছেন অতি মোনাফা লোভী ডিলার ও পাইকারী বিক্রেতারা। ফলে ভোজ্য তেল সয়াবিনের দাম ভোগাচ্ছে সিলেটের ক্রেতা সাধারণকে।
ক্ষুদে ব্যবসায়ীদের মতে, ভোজ্য তেল সয়াবিনের বাজার একদিনে অনিয়ন্ত্রিত হয়নি। সিলেটে বছরের ব্যবধানে অন্তত লিটার প্রতি দাম বেড়েছে ১২ বার, ৫ লিটার বোতলজাত সয়াবিনে দাম বাড়ানো হয়েছে অন্তত ২২ বার এবং লুজ সয়াবিন ও পলিপ্যাকে দাম বেড়েছে অন্তত ১৬ বার। ফলে বছর ব্যবধানে তেলের দাম বেড়ে দ্বিগুন হয়েছে।
করোনার প্রদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধির শঙ্কা থাকলেও তখন অনেকটা স্থিতিশীল ছিল বাজার। কিন্তু তেলের বর্তমান বাজার করোনার দু:সময়কেও হার মানিয়েছে, বলে মন্তব্য করেছেন ভোক্তারা।
সিলেটের বাজারে যেখানে ৯০/৯৫ টাকা ছিল বোতলজাত সয়াবিনের লিটার। সেই সয়াবিনের লিটার এখন ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে ১৬৮ থেকে ১৮০ টাকায়। আর ৫ লিটারের বোতল ৪৫০ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমান মূল্য দাঁড়িয়েছে ৭৯৫ টাকায়।সিলেটের খুচরা বাজার ঘুরে এমন তথ্য জানিয়েছেন ব্যবসায়ীদের অনেকে।
ব্যবসায়ীদের মতে, ভোজ্য তেল সয়াবিনের দাম একদিনে বাড়েনি। গত বছরে ধাপে ধাপে দাম বাড়িয়েছে কোম্পানীগুলো। ৫/১০ টাকা করে বাড়াতে বাড়াতে বর্তমানে আগের দামের দ্বিগুণ হয়েছে। তবে আগে থেকে ভোজ্য তেলের বাজার সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণে থাকলে আজ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না, মনে করছেন ক্ষুদে বিক্রেতা ও ভোক্তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেটের সবচেয়ে বড় পাইকারি হাট কালিঘাট। সেখানে ৫/১০ টাকা কমে কিনে এনে এই নিত্যপণ্য খুচরা বাজারে ৫/১০ টাকা লাভে বিক্রি করতে হয়। ফলে এর নিয়ন্ত্রণ খুচরা বাজারে নেই। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন বড় বড় ব্যবসায়ীরা। দাম বাড়াতে গিয়ে তারা কোটি কোটি টাকার সয়াবিন তেল মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছেন।
সিলেটের বাজারে খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে প্রতি লিটার সয়াবিন কোম্পানী ভেদে রূপচাঁদা, ফ্রেস, তীরসহ অন্যান্য কোম্পানীগুলোর তেল লিটার প্রতি ১৬৮/১৭০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
করোনাকালে লিটার ছিল ৯০/৯৫ টাকা। এরপর লিটার প্রতি ৫/১০ টাকা করে বাড়তে শুরু করে। এরপর-বোতলজাত সয়াবিনের লিটার ১২০/১৩০/১৩৫/১৪০/১৪৫/১৫০/১৬০/১৬২/১৬৫ সর্বশেষ ১৬৮ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। আর ৫লিটার বোতল ৪৫০ টাকা ছিল ২০২০ সালে। এরপর ক্রমশ; ৪৬০/৪৯০/৫১০/৫১৫-২০/৫৩০/৫৫০/৫৭০/৫৯০-৯৫/৬৩০/৬৫০-৫৫/৬৮০/৬৯০/৭১০/৭২০/৭৫০-৫৫/৭৮৫ এবং সর্বশেষ ৭৯৫ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে।
এই সময়ে পলিপ্যাক সয়াবিন লিটারে দাম বেড়েছে ১৬ বার। বর্তমানে পলিপ্যাক সয়াবিন সিলেটের খুচরা বাজারে লিটার বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ টাকায়। ২০২০ সালে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা দরে লিটার বিক্রি হতো। সময়ের ব্যবধানে ৫/১০ টাকা করে বাড়তে শুরু করে। এরপর প্রতি লিটার ৮০/৮৫/৯০/৯২/৯৫/৯৭/১০৫/১১৫/১২০/১২৫/১৩০/১৩৫/১৪৩ টাকা বিক্রি হয়েছে।
সিলেটের মিরাবাজার সৌরভ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মঞ্জু তালুকদার বলেন, ১০০ টাকা দামের এক প্যাকেট বিস্কুট বিক্রি করে যে লাভ হয়, সয়াবিন তেলের বোতলজাত ৫ লিটার সয়াবিন বিক্রি করে কমিবেশি সমান লাভ। আমরাতো ক্রেতার কাছ থেকে বেশি রাখতে পারিনা। কোম্পানী আমাদের যে দামে দেয়, তার চেয়ে ১০/১৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি করি। বছর অন্তে দফায় দফায় সয়াবিন তেলের দাম এখন দ্বিগুন বেড়েছে। এতে করে ভোক্তা সাধারণের নাভিশ্বাস ওঠেছে।
সিলেটের কালিঘাট আমজদ আলী সড়কের ব্যবসায়ী রূপক দাস বলেন, ২০২১ সাল থেকে সয়াবিনের দাম বাড়তে শুরু করে। ক্রমান্বয়ে এই পর্যায়ে এসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৬০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৩৬ টাকা নির্ধারিত ছিল। বোতলজাত সয়াবিনের ৫ লিটারের দাম ৭৬০ ও পাম তেলের দাম ছিল প্রতি লিটার ১১৮ টাকা। বর্ধিত দাম অনুযায়ী, প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ৮ টাকা বেড়ে ১৬৮ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৭ টাকা বেড়ে ১৪৩ টাকা, বোতলজাত সয়াবিনের ৫ লিটারের দাম ৩৫ টাকা বেড়ে ৭৯৫ ও পাম তেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে ১৩৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত ১ মার্চ থেকে খুচরা বাজারে গ্রাহকদের বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রতি লিটার কিনতে হবে ১৮০ টাকায়। এক লিটার লুজ সয়াবিন তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪৩ টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিক্রেতা বলেন, ভোজ্য তেলের বাজার হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অধিক মুনাফা লোভী কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা সিলেটের বাজারেও তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন।এ বিষয়ে প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
সিলেটের মোদি দোকানীদের অনেকে বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ ইস্যুতে সিলেটেও তেলের বাজারে দাম বাড়িয়েছেন ডিলার ও পাইকারী ব্যবসায়ীরা।
গত মঙ্গলবার (৮ মার্চ) সিলেচে নগরের কালিঘাটে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ভ্রা্ম্যমান আদালত পরিচালনা করে। অভিযানকালে সয়াবিন তেল সংকট দেখিয়ে গুদাম ভর্তি করে রাখার প্রমাণ পাওয়া যায়। এমন অপরাধে কালিঘাটের একাধিক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়েছে। এছাড়াও বোতলের গায়ের আসল দামের উপর টেম্পারিং করে বাড়তি দাম লেখার দায়েও কয়েকজন পাইকারি বিক্রেতা ও ডিলারকে জরিমানা করা হয়। পৃথক অভিযানে মূল্য তালিকা সংরক্ষণ ও প্রদর্শন না করা, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য সংরক্ষণ, নির্ধারিত মূল্যের অধিক মূল্যে ভোজ্যতেল বিক্রয় এবং টেম্পারিং করার অপরাধে মোট দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



