সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে প্রবাসীর স্ত্রী শাহনাজ পরভীন জ্যোৎস্নাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌরশহরের মির্জা আব্দুল মতিন মার্কেটের ‘অভি মেডিকেল হলে’ প্রবাসীর স্ত্রী শাহজান বেগম জ্যোৎস্নাকে ঘুমের বড়ি খাইয়ে গণধর্ষণ করে ফার্মেসী মালিক ও তার অপর দুই বন্ধু। চেতনা ফিরলে ধর্ষণের তথ্য ফাঁস করতে চাওয়ায় জ্যোৎস্নাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়।
হত্যার পর মরদেহ গুম করতে ৬ টুকরো করে ওষুধের কার্টুনে ঢোকিয়ে রাখা হয় সুবিধামতো মাছের ফিসারিতে ফেলতে। কিন্তু রাত পোহাতে চলায় হত্যাকারীরা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তাই কার্টুনে ঢোকিয়ে রাখা খন্ডিত মরদেহ ভেতরে রেখে ফার্মেসী তালাবদ্ধ করে পালিয়ে যায়। গ্রেফতারের পর ফার্মেসী আসামিরা পুলিশের বিশেষ একটি সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে নৃশংস ঘটনার এমন বর্ণনা দেয়।
ঘটনার তদন্তে নেমে সিআইডির একাধিক টিম অতি অল্প সময়ের মধ্যে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করে। কীভাবে এবং কেন তাকে হত্যা করা হয়েছিল, সেই তথ্য বের করার পাশাপাশি শুক্রবার তিনজনকে গ্রেফতার করে সিআইডি।গ্রেফতারকৃতরা হলেন- ‘অভি মেডিকেল হল’ নামের ফার্মেসির মালিক জিতেশ চন্দ্র গোপ, তার বন্ধু অনজিৎ চন্দ্র গোপ ও অসীত চন্দ্র গোপকে।
শনিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সিআইডির সদর দপ্তরে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ দেন বিশেষ এই বাহিনীর এলআইসি শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার মুক্তাধর ।
তিনি জানান, জোৎস্নার জ্ঞান ফিরলে বিষয়টি পরিবারকে জানাতে চাইলে ওই তিনজন তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরে তিনজন মিলে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরে লাশটি ফল কাটার ধারালো ছুরি দিয়ে মাথা, দুই হাত, দুই পা এবং বুক, পেটসহ ৬টি অংশে ভাগ করে ফেলে। দোকানে থাকা ওষুধের কার্টুন দিয়ে খণ্ডিত অংশগুলো ঢেকে রেখে ফার্মেসি তালা দিয়ে তারা চলে যান।
প্রেস ব্রিফিংয়ে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, শারিরিকে সমস্যার কারণে জন্য ফার্মেসীতে গেলে কথিত চিকিৎসক ফার্মেসী মালিক ও তার দুই বন্ধু মিলে জ্যোৎস্নাকে ঘুমের বড়ি খাইয়ে গণধর্ষণ করে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার আশঙ্কায় জ্যোৎস্নাকে ফল কাটার ছুরি দিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার পর মরদেহ মাছের ফিসারিতে ফেলার পরিকল্পনা করে। কিন্তু তাতে ব্যর্থ হয়ে ‘ঘাতক’রা মরদেহ ৬ টুকরো করে ওষুধের কার্টুনে ভরে ফেলে। তাদের খেয়াল ছিল সুবিধামতো মরদেহ ফিসারিতে নিয়ে ফেলা। কিন্তু ভোরবেলা লোকজনের চলাচল শুরু হওয়ায় তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। পরে ফার্মেসী থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়্।
সিআইডি জানায়, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর থানার পৌর এলাকার ব্যারিস্টার আবদুল মতিন মার্কেটের অভি মেডিকেল হল নামের একটি ওষুধের দোকান থেকে শাহনাজ পারভীন জ্যোৎস্না উপজেলার নারকেলতলা গ্রামের সৌদি প্রবাসী ছরকু মিয়ার স্ত্রী। এ ঘটনায় ওইদিনই নিহতের ভাই হেলাল উদ্দিন বাদী হয়ে জগন্নাথপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলা নম্বর-০৮/১৫।
সংবাদ সম্মেলনে মুক্তাধর জানান,শাহনাজ জোসনা ২০১৩ সাল থেকে জগন্নাথপুর পৌর শহরে নিজের বাসায় দুই ছেলে, এক মেয়ে, বৃদ্ধা মা ও ভাই-বোনদেরকে নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন।ওষুধপত্র কেনার সুবাদে অভি মেডিকেল হলের মালিক জিতেশের সাথে জ্যোৎস্নার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। জ্যোৎস্নার কিছুদিন ধরে গোপন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন।গত ১৬ ফেব্রুয়ারি জিতেশ জ্যোৎস্নার মায়ের প্রেশার মাপার জন্য তাদের বাড়িতে যান। তখন জ্যোৎস্নার তার গোপন সমস্যার কথা জিতেশকে জানালে তিনি তাকে দোকানে যেতে বলেন। ওইদিন বিকালে জ্যোৎস্নার জিতেশের দোকানে গেলে তাকে দোকানে কাস্টমার রয়েছে বলে অপেক্ষা করতে বলে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন।
মুক্তাধর আরও জানান, অনেক রাত হলে বাসায় যাওয়ার জন্য জ্যোৎস্নার অস্থিরতা বেড়ে যায়। তখন ওই ফার্মেসির মধ্যে তাকে একটি ঘুমের ওষুধ খেতে দেন জিতেশ। এতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন জ্যোৎস্নার। তখন জিতেশ, তার দুই বন্ধু অনজিৎ এবং অসীত গোপ তাকে ধর্ষণের পরিকল্পনা করেন।
জিতেশ তার ফার্মেসিতে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার কক্ষে জোসনাকে বসিয়ে রাখেন। সেখানে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লে তাকে ঘরে রেখে ফার্মেসির তালা বন্ধ করে বাইরে চলে যান জিতেশ।
এরপর রাত গভীর হলে আশেপাশের দোকান যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন জিতেশ ও তার দুই বন্ধু ফার্মের্সি খুলে এনার্জি ড্রিংকস পান করে ধর্ষণ করেন।
বিষয়টি শাহনাজ তার পরিবারকে জানিয়ে দেবেন বললে জিতেশ ও তার বন্ধুরা তার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে এবং মুখে বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।
পরে ওই ফার্মেসিতে থাকা ফল কাটার ছুরি দিয়ে লাশটি দুই হাত, দুই পা এবং বুক পেটসহ ছয়টি টুকরা করেন। এরপর দোকানে থাকা ওষুধের কার্টুন দিয়ে খণ্ডিত অংশগুলো ঢেকে রেখে ফার্মসিতে তালা লাগিয়ে চলে যান।
পরে খণ্ডিত মরদেহ পাশের একটি মাছের খামারে ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ভোর হয়ে যাওয়ায় এবং লোকজন চলে আসায় তারা সেই কাজটি করতে পারেননি।
সংবাদ সম্মেলনে মুক্তাধর বলেন, ‘এই ঘটনার পর সিআইডির এলআইসি শাখার একাধিক দল আসামি গ্রেফতারের জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালায়।
শুক্রবার রাজধানীর ভাটারা থানার নুরেরচালা এলাকায় অভিযান চালিয়ে জিতেশকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর জগন্নাথপুর থানার পৌর এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনজিৎ গোপ এবং অসীত গোপকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃত জিতেশ চন্দ্র গোপ কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার শহিলা গ্রামের যাদব চন্দ্র গোপের ছেলে, অনজিৎ চন্দ্র গোপ একই এলাকার রসময় চন্দ্র গোপের ছেলে ও অসীত চন্দ্র গোপ নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার সুয়াইর অলিপুর গ্রামের পতিত পবন গোপের ছেলে।
উল্লেখ্য, ‘অভি মেডিকেল হল’ নামের ফার্মেসি থেকে তালা ভেঙে গত বৃহস্পতিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সৌদি প্রবাসীর স্ত্রী শাহনাজ পারভিন জ্যোৎস্নার (৩৫) ছয় খণ্ড মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এর আগের দিন (বুধবার) বিকেল থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। তিনি সুরুক মিয়া নামের এক সৌদি আরব প্রবাসীর স্ত্রী। সুরুক মিয়ার বাড়ি উপজেলার নারিকেল তলাগ্রামে। জ্যোৎস্নার সন্তানদের নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে জগন্নাথপুর পৌরসভার পিছনের আবাসিক এলাকার একটি দুতলা (নিজস্ব) বাসায় বসবাস করে আসছেন।
নিহত শাহনাজ পারভিনের ছেলে উদয় জানান, বুধবার সকালে অভি মেডিকেল হলের মালিক জিতেন্দ্র গোপ তাদের বাসায় গিয়ে পারভিনের ব্লাড প্রেশার মাপেন। পরে তিনি পারভিনকে দোকানে যাওয়ার কথা বলে চলে যান। বিকেলে ওষুধ আনার উদ্দেশে পারভিন ঘর থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। রাতে উদয় তার মায়ের মোবাইল ফোনে কল দিলেও কেউ রিসিভি করেননি। বিষয়টি উদয় থানাপুলিশকে জানান।
পরে বৃহস্পতিবার পুলিশ জিতেন্দ্র গোপের ফার্মেসি থেকে পারভিনের খন্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে।
জগন্নাথপুর থানাপুলিশ লাশ উদ্ধারের দিন জানায়, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে অভি মেডিকেলের তালা ভেঙে প্রবেশ করলে দেখতে পাওয়া যায়, মহিলার দেহটি ছয় খণ্ড করা। দুই হাত ও পা আলাদা করে কাটা, মাথা এক খণ্ড, কোমর থেকে বুক পর্যন্ত আরেক খণ্ড। পরনে কোনো কাপড় ছিলো না। পারভিন নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে অভি মেডিকেল হলের মালিক জিতেন্দ্র তার পরিবার নিয়ে জগন্নাথপুর থেকে পালিয়ে যান।
এদিকে, নিহতের ভাই হেলাল মিয়া বলেন, বুধবার বেলা ৩টার দিকে আমার বোনকে অভি মেডিকেলের মালিক জিতেশ চন্দ্র গোপ অভি ফোন করে তার ফার্মেসিতে নিয়ে যান। এরপর আমার বোন আর বাসায় ফেরেনি। রাতে খোঁজাখুঁজির পর অভির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার বোনকে ফিরিয়ে দেবেন বলে বৃহস্পতিবার সকালে পৌরশহরের একটি বাজারে যেতে বলেন।
সকালে বাজারে গিয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করার পর অভিকে ফোন দেই, কিন্তু ফোন বন্ধ পাই। পরে পুলিশ নিয়ে তার বাসায় গিয়ে দেখি বাসার দরজায় তালা লাগানো। তখন আমাদের সন্দেহ হয়। দুপুরে বাজারে তার ফার্মেসিতে গিয়ে তালা ভেঙে আমার বোনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, জিতেন্দ্র গোপ ৯ বছর জগন্নাথপুর বাজারের বিভিন্ন ওষুধের দোকানে চাকরির পর গত এক বছর ধরে জগন্নাথপুর পৌরশহরের মির্জা আব্দুল মতিন মার্কেটে অভি মেডিকেল হল নামে একটি ফার্মেসি খুলে নিজে ব্যবসা শুরু করেন।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



