একাত্তরের সেই যুদ্ধদিনের কথা মনে পড়লে এখনো কাঁদেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজেদ আলী। কিন্তু তখন কাঁদেননি। যৌবনের টগবগে উন্মাদনাময় সেই দিনগুলোতে দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য যেমন অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন, তেমনি চোখ দুটো শিকারের নেশায় সবসময় জ্বলজ্বল করতো। শরীরে বাঘের শক্তি নিয়ে হায়েনাবধের নেশায় কেটেছে তার দীর্ঘ নয় মাস। মা বাবার কথা মনে পড়লেও একদিন এক মুহুর্তের জন্যও যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে ঘরে ফেরার কথা তাঁর মনেই হয়নি। এখন জীবনের এই পর্যায়ে এসে যখন পেছন ফিরে তাকান, স্মৃতির পাতা হাতড়ে হাতড়ে দেখেন যুদ্ধের সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলো, তখন কাঁদেন কখনো অঝর ধারায়, কখনোবা ডুকরে ডুকরে।
সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে সেই স্মৃতিগুলো যেমন মেলে ধরলেন, কাঁদলেন এবং হাসলেনও।
বাড়ি তার ফেঞ্চুগঞ্জের ঘিলাছড়ায়। সত্তরের শেষের দিকে যোগ দিয়েছিলেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে। তখন প্রশিক্ষণ সবে শেষ হয়েছে তাদের। চলে আসে একাত্তরের মার্চ। তার পোস্টিং ছিল ইপিআর ফোর উয়িং ব্যটালিয়নে। স্মৃতি হাতড়ে জানালেন, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষনের পর থেকেই বিহারী ও পাঞ্জাবী সহকর্মীরা তাদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করে। এমনকি কখনো কখনো তারা অনেক হিংসাত্মক হয়েও উঠছিল। তখন কুষ্টিয়া শহরে পাকবাহিনীর একটা ইউনিট ছিল। এরা স্থানীয় জনসাধারণকে নির্যাতন করছিল। বললেন, ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় আমরা কুষ্টিয়া টাউন ঘিরে ফেলি এবং রাতে হানাদারদের দুটি ইউনিট ধ্বংস করতে সক্ষম হই। যশোর থেকে একদল হানাদার কুষ্টিয়া আসছে- এমন খবরে আমরা যশোরের বারমারি গ্রামে গিয়ে ডিফেন্স করি। ৪ এপ্রিল শত্রæসেনারা আমাদের উপর আক্রমন চালায়। তাদের এই হামলায় আমাদের প্রচুর ক্ষতি হয়, হতাহত হন অনেকেই। শোকে কাতর হয়ে পড়ি আমরা। পুরো একরাত হেঁটে চুয়াডাঙা পৌঁছে দেখি পাকিস্তানিরা হেলিকপ্টার দিয়ে বোমা হামলা চালাচ্ছে। এই যুদ্ধেও আমাদের প্রচুর সৈনিক শহীদ হন। এক পর্যায়ে আমরা ভারতের বনগাঁ বিএসএফ ক্যাম্পে আশ্রয় নেই। এখানে একমাস প্রশিক্ষণ শেষে গেরিলা হামলার জন্য আমাদের দেশের ভেতরে পাঠানো শুরু হয়। এরকশ অন্তত শতাধিক অপারেশনে আমি অংশ নিয়েছি এবং সফলও হয়েছি।
একাত্তরের এই বীর মুক্তিসেনা জানালেন, উভয় পক্ষে খন্ড খন্ড যুদ্ধ চলতে থাকে। এতে আমাদের প্রচুর লোক শহীদ হন। তাদেরও অনেক সেনা নিহত হয়েছে। একাত্তরের ১০ বা ১২ এপ্রিল আমাদের উপর নির্দেশ আসে জামালপুর শহর আক্রমনের। আমরা ১২ এপ্রিল রাত ৪টার দিকে শত্রæসেনাদের ১০০ গজের মধ্যে পৌঁছে যাই। শুরু হয় আক্রমন পাল্টা আক্রমন। প্রচন্ড যুদ্ধ বাঁধলে একসময় আমরা ভারতীয় আর্টিলারি বাহিনীর সাহায্য চাই। তারা পাল্টা গুলি চালায়, তবে ভুল নিশানায়। এতে আমাদের প্রায় অর্ধেকের মতো সৈন্য শহীদ হন। আমার সাথে ছিলেন পাকিস্তান থেকে ফেরা লে. সামাদ এবং সিপাহী জাহাঙ্গীর। সামাদের উপর বোমা পড়লে তার দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। অবস্থা এতটাই শোকাচ্ছন্ন করে ফেলেছিল যে আমরা শোকে পাথর হয়ে যাই। ভোরের দিকে একটা গুলি এসে লাগে সিপাহী জাহাঙ্গীরের পেটে। আমার জীবন তখন প্রচন্ড ঝুঁকিতে। কিন্তু সহযোদ্ধাকে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা আমার ছিলনা। আামি জাহাঙ্গীরকে কাঁধে নিয়ে ছুটতে থাকি নিরাপদ আশ্রয়ের খুঁজে। দিনের আলোয় উদ্ধারকৃত আহত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যাওয়া হয় ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে। তাদের কেউ বেঁচেছেন, কেউবা শাহাদত বরণ করেছেন। ২ বা ৩ ডিসেম্বর আমাদের সরিয়ে নেয়া হয় জকিগঞ্জ সীমান্তে। এরপর করিমগঞ্জ হয়ে আমরা সিলেট পৌঁছে শহর ঘেরাও করি। তুমুল সংঘর্ষের পর একসময় আমরা সিলেট শহরকেও হানাদার মুক্ত করতে সক্ষম হই।
তখন সাজেদ আলী পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রায় ১৫/১৬ মাস হয়ে গেছে। চেনা শহর সিলেটে এলেও পাশেই ফেঞ্চুগঞ্জ, নিজের বাড়ি। কিন্তু যাওয়ার সুযোগ নেই। উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তারা রওয়ানা হলেন হবিগঞ্জের উদ্দেশ্যে। মা বাবা ভাই বোন আর আত্মীয় স্বজনের জন্য বুকটা বার বার মোচড় দিয়ে উঠলেও একটিবারও পালানোর চিন্তা করেন নি তিনি। গ্রামের একজনের সাথে দেখা হয়েছিল রেল স্টেশনে। উনি চিনতে না পারলেও সাজেদ আলী ঠিকই চিনেছিলেন তাকে। তার মাধ্যমে বাড়িতে খবর পাঠালেন, আমি বেঁচে আছি। ইনশাল্লাহ দেখা হবে। তারপর দেশের প্রয়োজনে সোজা হবিগঞ্জে চলে যান। তবে যাওয়ার আগে একটা কাজ করেন সাজেদ আলী। একটি সাদা কাগজে নিজের নাম ঠিকানাসহ ‘আমি বেঁচে আছি’ লিখে ট্রেনের জানালা দিয়ে স্টেশনে ফেলে যান। মনকে প্রবোধ দেন, হয়ত কেউ একজন পাবে এবং নিজের বাড়িতে এই খবর যাবে। হবিগঞ্জে মাসখানেক থাকার পর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকায়। সেখানে বিহারী ক্যাম্পের বিহারাদীরও সামলাতে হয়েছে তাদের।
টানা নয় মাস যুদ্ধ হলো খানসেনাদের সাথে। চুয়াডাঙা হয়ে ভারতে বিভিন্ন ক্যাম্প, শতাধিক গেরিলা অপারেশনে অংশ নেয়া, সম্মুখযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পর দেশ স্বাধীন হলেও সাজেদ আলীর বাড়ি ফেরা হয়না। ঢাকায় ক্যাম্পে বসে মাঝে মাঝে চোখ ঝাঁপসা করে অশ্রæর বন্যা নেমে এলেও, মনকেতো প্রবোধ দেয়া যায়না কিছুতেই। এরমধ্যেই বাহাত্তরের ফেব্রæয়ারির কোন একসময় তাদের পিলখানা ক্যাম্পে হাজির হন তার বৃদ্ধ পিতা সুরুজ আলী। প্রায় দেড় বছর পর সাক্ষাত হয় পিতাপুত্রের। দুজনের কান্নায় পিলখানার বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল। জ্ঞান হারানোর অবস্থায় পৌঁছে ছিলেন পিতাপুত্র। কিন্তু সাজেদ আলীর ছুটি এ যাত্রায়ও মিলেনি।
সুরুজ আলী ছেলেকে ক্যাম্পে রেখে বাড়ি ফিরে ্এলে তার মা সমুজা বিবি চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন। তিনি বুঝতে পারেন তার ছেলে আর নেই, স্বামী তাকে মিথ্যা প্রবোধ দিচ্ছেন। এ অবস্থায় কয়েকদিন পর আবারও সুরুজ আলী ছুটে যান ঢাকার পিলখানায়। উর্ধ্বতনদে বুঝিয়ে সুজিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ছেলেকে সাথে নিয়ে ফিরে আসেন বাড়িতে।
সেই স্মৃতিও তরতাজা সজেদ আলীর। জানালেন ফেঞ্চুগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন থেকে শুরু করে তার গ্রাম ঘিলাছড়ার বাড়ি পর্যন্ত পা ফেলার উপায় ছিলনা। ভালোবাসার মানুষগুলো অধির আগ্রহে একনজর তাকে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন। কেউ কেঁদেছেন, কেউবা আনন্দ প্রকাশ করেছেন। আর প্রিয় জননী এবং এবং পবিবারের অন্যান্য সদস্যদের অবস্থা যে কেমন ছিল, তা সহজেই অনুমেয়। হাসি আর কান্নার অবিমিশ্র অনুভুতি নিয়ে তারা দেড় বছর পর নিজের বাড়িতে ও গ্রামে স্বাগত জানিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজেদ আলীকে।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



