তিন বেডরুমের (শয়নকক্ষ) বাসায় খাবার ও বসার রুম আরো দুইটি। সব মিলিয়ে রান্না ঘর ছাড়া রুম পাঁচটি। সেই পাঁচ রুমের বাসায় মাত্র ছয়জন মানুষ থাকতেও মানা বাড়িওয়ালাদের। আর বাড়িভাড়া নিলে সিঁড়ি দিয়ে আস্তে ওঠা, অতিথি আসতে মানা, বেশি রাতে বাসায় না ঢুকাসহ নানা শর্ত ছুড়ে দেন মালিকরা। সিলেটে এভাবেই বাড়িভাড়া নিতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন ভাড়াটেরা। বিশেষ করে বড় পরিবারের জন্য বাড়িভাড়া নিতে নজিরবিহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীদের।
সুষ্ঠু নীতিমালা ও নগর কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে সিলেটে বাড়িভাড়া নিয়ে চলছে চরম নৈরাজ্য। নীতিমালা লঙ্ঘন করে বছরে বছরে বাড়ছে বাড়িভাড়া। আর ভাড়াটে বদলালে তো কথাই নেই বাড়িভাড়া বেড়ে যায়। বাড়িভাড়া আইনের সুষ্ঠু তদারকির অভাবে এককভাবে প্রভাব খাটাচ্ছেন বাড়িওয়ালারা। এতে তাদের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ছেন ভাড়াটেরা।
আইনত দুই বছরের মধ্যে ভাড়া না বাড়ানোর নির্দেশ থাকলেও বাড়ির মালিকরা ভাড়া বাড়াচ্ছেন প্রতিবছর। এতে করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর আয়ের বড় অংশটাই চলে যাচ্ছে বাড়িভাড়া বাবদ। তার প্রভাব পড়ছে জীবনমান, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রেই।
বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ১৯৬৪ অনুযায়ী, ভাড়াটিয়া ব্যক্তি বাড়ি বা দোকান ভাড়া নেওয়ার দুই বছর পার না হলে মালিক ভাড়া বাড়াতে পারবেন না। ভাড়া পরিশোধ নিয়ে কোনো বিরোধ দেখা দিলে বাড়ির মালিক বা ভাড়াটিয়ার দরখাস্তের ভিত্তিতে দুই বছর পর পর ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রক’ যাচাই-বাছাই করে মানসম্মত ভাড়া পুনঃনির্ধারণ করতে পারবেন। বাড়িওয়ালা যদি মানসম্মত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে আদায় করেন তাহলে প্রথমবার অপরাধের জন্য মানসম্মত ভাড়ার অতিরিক্ত আদায়কৃত টাকার দ্বিগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ড দণ্ডিত হবেন এবং পরে প্রতিবার অপরাধের জন্য ওই অতিরিক্ত টাকার তিনগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। কিন্তু বাড়ি মালিকদের প্রভাবের কারণে ভাড়াটিয়ারা আইনি প্রতিকার পান না। বাড়িওয়ালাদের এমন একক আধিপত্যে বাসা ছাড়তে বাসা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। বাড়িভাড়া বৃদ্ধির এই নৈরাজ্য রোধে তদারকি করতে দেখা যায় না কোনো সংস্থাকে।
নগরীর শামিমাবাদ আবাসিক এলাকায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন বেসরকারি চাকরিজীবী জাকারিয়া হোসেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বাড়িভাড়া নেন তিনি। বছর শেষ হওয়ার আগেই গত মাসে বাড়িভাড়া ৫০০ টাকা বাড়ানোর নোটিশ দেন মালিক। এ নিয়ে মালিকের সঙ্গে বাদানুবাদের ঘটনা ঘটে। সপ্তাহখানেক পরে মালিকপক্ষ দুই মাসের মধ্যে বাড়িছাড়ার নোটিশ দেন।
জাকারিয়া বলেন, বাড়িভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদ করায় বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিয়েছেন মালিক। বাড়িওয়ালার এমন আচরণে ভবনের প্রতিটি ভাড়াটেই অতিষ্ঠ।
একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মজিদ, দুই বছর অন্তর অন্তর সমঝোতার বৃদ্ধিতে বাড়িভাড়া বাড়ানোর বিধান থাকলেও বছরে বছরে বাড়ছে ভাড়া। অল্প আয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে বাড়িভাড়ায়। এতে সংসারের অন্যান্য খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
গত কয়েক দিনে সিলেটের ১০-১২ জন ভাড়াটেদের সঙ্গে কথা বলা জানা গেছে, বাড়িভাড়া বাড়ানো ছাড়াও নতুন ভাড়াটেদের উপর কঠোর শর্ত ছুড়ে দিচ্ছেন বাড়িওয়ালারা। তিনটি বেডরুমের (শয়ন কক্ষ) বাসায় ৫ জনের বেশি সদস্য থাকতে পারবেন না-এমন শর্তও দিচ্ছেন বাড়ির মালিকরা। তাছাড়া সিঁড়ি দিয়ে আস্তে ওঠা, অতিথি আসতে মানা, বেশি রাতে বাসায় না ঢুকাসহ নানা শর্ত মেনে নিয়ে নতুন ভাড়াটে ওঠতে হচ্ছে। বাড়িওয়ালাদের এমন বিধিবহির্ভূত আচরণে অতিষ্ঠ ভাড়াটেরা।
এদিকে ভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি বাসা বদলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে নগরের বাসিন্দাদের। নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় লাইনের গ্যাস সংযুক্ত বাসা মেলানো সোনার হরিণ হয়ে গেছে। আর পাওয়া গেলেও ভাড়া অনেক বেশি।
জানা গেছে, সিলেট নগরে লাইনের গ্যাস সংযুক্ত দুই বেডরুমের বাসা এখন সর্বনিম্ন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। আর তিন বেডরুমের বাসা সর্বনিম্ন ১৫ হাজার টাকা। অথচও বছর পাঁচেক আগে দুই বেডরুমের বাসা ছিল ৬-৭ হাজার টাকা আর তিন বেডরুমের বাসা ছিল ৮-১০ হাজার টাকা।
সুনামগঞ্জের তাহির উপজেলার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট ফয়ছল আবেদীন সেনা জানান, অন্তত দুই মাস থেকে ভাড়ায় বাড়ি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। আয়ের সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে বাসা খুঁজতে পুরো সিলেট নগর ঘুরে বেড়িয়েছি। কোথাও কম ভাড়ায় বাড়ি পাইনি। যেসব এলাকায় তুলনামুলক বাড়িভাড়া কম সেসব এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় জানান, বাড়িভাড়া নিয়ে সুর্নিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। অতিরিক্ত বাড়িভাড়া নেওয়া হচ্ছে এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে। সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
নতুনসিলেট২৪ডটকম / এএ
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



