ব্যবসা-বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানি খাতে বিরাজমান সমস্যা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ১৭ প্রস্তাবনা দিয়েছে সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি।
শনিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি তাহমিন আহমদ ১৭টি প্রস্তাবনা সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেনের হাতে তুলে দেন।
এদিন সকালে হবিগঞ্জের দি প্যালেস রিসোর্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১০টি উদ্ভাবনী উদ্যোগ বিষয়ক বিভাগীয় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।এই অনুষ্ঠানেই সিলেট চেম্বার সভাপতি নিজের প্রস্তাবনাগুলো প্রধানমন্ত্রী বরাবরে প্রেরণ করেন।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি’র সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক তাহমিন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন এসব প্রস্তাবনা প্রধানমন্ত্রীকে অবগত করাসহ সমস্যাগুলো সমাধানে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
প্রস্তাবনায় তিনি বাংলাদেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করেন। অথছ এসব খাতে কতিপয় সমস্যাবলী বিরাজমান থাকায় সিলেটের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ব্যাহত ও নতুন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছেন। এসব সমস্যাবলী নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
প্রস্তাবনাগুলো মধ্যে রয়েছে-সিলেট থেকে রপ্তানি বৃদ্ধিতে ওয়্যার হাউজ ও প্যাকিং হাউজ নির্মাণ, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্যাগেজ সিস্টেম চালু, জকিগঞ্জ-করিমগঞ্জ বর্ডার দিয়ে বাঁশ আমদানির সুযোগ প্রদান, সিলেটের সকল স্থলবন্দর দিয়ে ফল আমদানি পুণরায় চালু, বিসিক শিল্প মালিকদের উপর অতিরিক্ত ভ্যাট আরোপ বন্ধকরণ, সিলেটে নতুন বিসিক শিল্প নগরী স্থাপন, তামাবিল ও শেওলা স্থলবন্দরের পাশে ব্যক্তি মালিকানাধীন ও ভাড়াকৃত জমিতে আমদানিকৃত মালামাল স্তুপীকরণে বিজিব কর্তৃক বাঁধা প্রদান বন্ধকরণ, ভোলাগঞ্জ শুল্ক স্টেশনে ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট চালু, শেওলা স্থলবন্দরে সোনালী ব্যাংকের বুথ খোলা, ভোলাগঞ্জ শুল্ক স্টেশনকে স্থলবন্দরে উন্নীত না করা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠান সমূহে বাণিজ্যিক হারে গ্যাস বিল প্রদান না করা, সিলেটের পাথর কোয়ারীগুলোতে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন পুণরায় চালু, পুরাতন গ্যাস লাইন মেরামত, সিলেট আমদানি-রপ্তানি সহকারী নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের সেবার মান বৃদ্ধি, এলজিইডি বিভাগের কাজের রেট পুনঃনির্ধারণ, কৈলাশটিলা এলপিজি প্লান্ট পুণরায় চালু এবং বিনিয়োগ ও পর্যটন খাতের বিকাশে রেল সেবার মান উন্নয়ন।
সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ড. মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব মোঃ তোফাজ্জল হোসেন মিয়া। অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার ১০টি উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বৃহত্তর সিলেটের বিনিয়োগ সংক্রান্ত সমস্যাবলী নিয়ে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক জুলিয়া যেসমিন মিলি।
অনুষ্ঠানে সিলেট বিভাগের চার জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ বিভাগ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বিদ্যুৎ বিভাগ, শিক্ষা বিভাগ, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বিসিকসহ বিভিন্ন সরকারী দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ, চার জেলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জেলা চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধিবৃন্দ, জেলা বার এসোসিয়েশন, প্রেসক্লাব এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রস্তবনায় বলা হয়- বর্তমানে সিলেটের রপ্তানিকারকদের ঢাকা থেকে তাজা শাক-সবজি ও ফলমূল যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে রপ্তানি করে থাকেন। এতে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় হয়। পাশাপাশি প্রচুর সময় নষ্ট হয়। তাই ঢাকার শ্যামপুরের ন্যায় সিলেটে একটি ওয়্যার হাউজ ও সার্টিফিকেশন ল্যাব নির্মাণ। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সিলেট চেম্বারের উদ্যোগে এক মতবিনিময় সভায়কৃষিমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এবং একাধিক সংসদ সদস্য ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।এছাড়াও স্থায়ী প্যাকিং হাউজ ও সার্টিফিকেশন ল্যাব নির্মাণে বিলম্ব হলে অস্থায়ীভিত্তিতে কোন ভাড়াকৃত ভবনে এ কার্যক্রম চালুর আশ্বাস প্রদান করেছিলেন।কিন্তু প্রায় ৬ মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। যার ফলে সিলেট থেকে বিমানযোগে পণ্য রপ্তানি করা যাচ্ছে না, এতে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছেন তেমনি রপ্তানিকারকগণও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।
সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং সিলেটের রপ্তানিকারকদের সুবিধার্থে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি স্থানে ঢাকার শ্যামপুরের ন্যায় একটি ওয়্যার হাউজ/প্যাকিং হাউজ ও সার্টিফিকেশন ল্যাব নির্মাণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্যাগেজ সিস্টেম চালু: সিলেটের বিশাল জনগোষ্ঠী ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করেন। দেশে প্রচুর রেমিটেন্স প্রেরণের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। এসব প্রবাসীগণ সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করে থাকেন। কিন্তু সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে ব্যাগেজ সিস্টেম চালু না থাকায় প্রবাসীগণকে মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হয়। ইতোপূর্বে বিমানবন্দরে ব্যাগেজ সিস্টেম চালু থাকলেও প্রায় আড়াই বছর যাবৎ তা বন্ধ রয়েছে। তাই যাত্রীদের ভোগান্তি লাঘবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ন্যায় সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ন্যায় ব্যাগেজ সিস্টেম চালুর অনুরোধ জানান।
সম্প্রতি সিলেটের ভয়াবহ বন্যায় ঘর-বাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে সিলেটের প্রায় সবকটি বাঁশমহাল পানিতে তলিয়ে গেছে। বর্তমানে যেসব বাঁশমহাল রয়েছে সেগুলো থেকে সিলেটের চাহিদা মেটানো হলে সিলেটের পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হবে। ক্ষতিগ্রস্থ ঘর-বাড়ি মেরামতে সিলেট প্রায় এক কোটি বাঁশের চাহিদা রয়েছে। আর সিলেটে যে পরিমান বাঁশের যোগান রয়েছে, তা পর্যাপ্ত নয়। সিলেটের জকিগঞ্জ-করিমগঞ্জ বর্ডার দিয়ে নদীপথে ভারত থেকে বাঁশ আমদানির সুযোগ প্রদান করা হলে আমদানি খরচ কম পড়বে এবং স্থানীয় বাঁশের চাহিদা পূরণ করা যাবে।
বর্তমানে সিলেটের সকল স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন দিয়ে ফল আমদানি বন্ধ রয়েছে। এতে সিলেটের ফলের চাহিদা মেটাতে দেশের অন্যান্য অঞ্চল দিয়ে আমদানিকৃত ফল সিলেটে আনতে হয়। যার ফলে পরিবহন ব্যয় বেশী হওয়ায় বাজারে ফলের মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং টাটকা ফল থেকে সিলেটবাসী বঞ্চিত হন। এছাড়াও বেশ কিছুদিন যাবৎ ফল আমদানি বন্ধ থাকায় এ খাতের সাথে জড়িত আমদানিকারক, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকগণ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। তাই ফলের বাজারমূল্য স্বাভাকি রাখতে এবং এ খাতে জড়িত ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের কথা বিবেচনা করে সিলেটের সকল স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন দিয়ে ফল আমদানি পুণরায় চালুর দাবি জানানো হয়।
সরকারী আইন অনুযায়ী বিসিক শিল্প নগরীতে অবস্থিত শিল্প প্রতিষ্ঠান সমূহের কাছথেকে ৪ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায়ের বিধান রয়েছে। কিন্তু ভ্যাট কর্তৃপক্ষ ইচ্ছামাফিক বিসিক শিল্প মালিকদের উপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করছেন।ফলে সিলেটের দুইটি বিসিক শিল্প নগরীতে অবস্থিত শিল্প প্রতিষ্ঠান মালিকগণ আর্থিক ক্ষতির মধ্যে রয়েছেন এবং উদ্যোক্তাগণ নতুন শিল্প স্থাপনে আগ্রহী হচ্ছেন না। তাই বিসিকের শিল্প প্রতিষ্ঠান সমূহের উপর অতিরিক্ত ভ্যাট আরোপ বন্ধ করার দাবি তুলে ধরেন।
সিলেটের খাদিমনগর ও গোটাটিকরে দুইটি বিসিক শিল্প নগরী রয়েছে। কিন্তু উক্ত দুইটি শিল্প নগরীতে কোন প্লট খালি না থাকায় নতুন উদ্যোক্তারা কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারছেন না। সিলেটে নতুন আরেকটি শিল্প এলাকা গড়ে তুলতে পারলে এখানে উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে স্থানীয় ভোক্তাদের চাহিদা পূরণ করে তা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সমূহে রপ্তানি করা যাবে। এ লক্ষ্যে সিলেট চেম্বার অব কমার্সের দাবীর প্রেক্ষিতে সিলেটে নতুন বিসিক শিল্প নগরী গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিসিক, সিলেট এর পক্ষ থেকে ১৬৫ একর জমি নির্বাচন করে তা বরাদ্দের ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত সরকারের পক্ষ হতে আশানুরূপ কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এছাড়া তামাবিল ও শেওলা স্থলবন্দরের পার্শ্ববর্তী ব্যক্তি মালিকানাধীন ও ভাড়াকৃত স্থানে আমদানিকৃত পণ্য রাখতে বিজিবি কর্তৃক বাঁধা প্রদান বন্ধকরণের দাবি জানিয়েছেন।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



