১৩ দিন পর অবশেষে চা বাগানগুলোতে ফিরেছে প্রাণ। চায়ের সবুজ গালিচায় দাঁড়িয়ে নারী চা শ্রমিকদের হাতের স্পর্শ লেগেছে দুটি পাতা একটি কুঁড়িতে।
একটি একটি করে দুটি পাতা একটি কুঁড়ি তুলে জড়ো করে কাঁধে রাখা ঝুলন্ত ব্যাগে সেগুলো দ্রুতই ভরছেন। এ দৃশ্য যেন চা বাগানের চিরায়ত সৌন্দর্য।
তবে এ সৌন্দর্যটি কিছুদিনের জন্য ম্লান ও স্থবির হয়ে গিয়েছিল দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে ৩০০ টাকায় বর্ধিত করার দাবিতে আন্দোলনে।

দেশের ১৬৮টি বাগানে (ফাঁড়ি চা বাগানসহ ২৩২টি) ছড়িয়ে পড়েছিল এ আন্দোলন। চা শ্রমিকরা তাদের দৈনিক কাজ বন্ধ রেখে নেমে পড়েন মহাসড়কে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে বাগানে বাগানে মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ হয়।
সবশেষে রোববার (২১ আগস্ট) রাতে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মীর নাহিদ আহসানের আন্তরিক তৎপরতায় বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা রেখে চা শ্রমিকদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নেন। এ কর্মবিরতি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সকালের ভেতরই সব বাগানে পৌঁছে যায়।

এ সিদ্ধান্তের ফলেই চা বাগানগুলোর সেকশনে সেকশনে (চা আবাদের একত্রিক সুনির্দিষ্টি পরিমাণ ভূমি) নারী চা শ্রমিকরা জড়ো হয়ে যে যার মতো করে চা পাতা তুলছেন।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা গেছে, সিলেট ভ্যালীর আওতাধীন ২৩টি ও মৌলভীবাজার জেলার ৯২টি চা বাগানেই সোমবার (২২ আগস্ট) শ্রমিকরা কাজে যোগদান করেছেন। তবে শ্রমিকদের একাংশ এখনো মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে কাজে যোগ দেননি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সোমবার সকাল থেকে সিলেটের লাক্কাতুরায় চা বাগান এলাকায় শ্রমিকরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। তারা রাতের আধারে সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে মজুরী বৃদ্ধির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।তবে বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের মধ্যে দুটি পক্ষ তৈরি হয়ে একটি পক্ষ কাজে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আর শ্রমিকদের একাংশ কাজে ফেরায় বাগান মালিকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।

সিলেটের লাক্কাতুড়া বাগানে গিয়ে পাতা উত্তোলেনের একই দৃশ্য চোখে পড়ে। প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধের ফলে দুটি পাতা একটি স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বড় হয়ে গেছে। তাও তারা অনায়সে তুলে নিচ্ছেন। দেখা গেল, যে পাতাগুলো বেশি বড় হয়ে গেছে সেগুলো তারা দু’বারে তুলে নিচ্ছেন।
লাক্কাতুড়া চা বাগানে পাশাপাশি দূরত্বে দাঁড়িয়ে চা পাতা চায়নকালে নারী শ্রমিকদের অনুভূতি জানতে চাইলে তারা বলেন, অনেক দিন পর কাজে ফিরতে পেরে বেশ ভালো লাগছে। তারা আশায় বুক বেঁধেছিলেন কিছুদিনের মধ্যেই এ মজুরি সমস্যা সমাধান হবে।
দুপুর রোদের তীব্রতায় দাঁড়িয়ে অপর নারী শ্রমিকরা ক্রমশই পাতা তুলে চলেছেন। তাদের হাতের এ দ্রুতগতিই যেন সমৃদ্ধির বার্তা ছড়াচ্ছে চা বাগানে।
চা বাগানের সেকশনে নারী চা শ্রমিকদের পাতা উত্তোলনে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেবার জন্য থাকে একজন সর্দার। একেকটি গ্রুপে একজন সর্দারের নিয়ন্ত্রণে থাকেন প্রায় ৫৫ জন নারী শ্রমিক।
চা বাগান সূত্র জানায়, বাগান ১৩ দিন বন্ধ ছিল। আজ সকালে আমাদের নেতাদের নির্দেশ পেয়ে আমরা বাগান চালু করেছি। বেলা ১টা থেকে চা পাতা উত্তোলনের কাজ আমরা শুরু করেছি। আমরা বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করবো। চা গাছ তেমন কোনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, চা পাতা সামান্য একটু লম্বা হয়ে গেছে। এটাতে কোনো সমস্যা হবে না। আরও যদি কিছুদিন বাগান বন্ধ থাকতো তবে চা বাগানের পাতাগুলোর ক্ষতি হয়ে যেত। বড় হয়ে যাওয়া পাতাগুলোকে মাঝখানে ভেঙে দুই অংশ করে নিতে হবে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট ভ্যালীর সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রাজু গোয়ালা বলেন, ধর্মঘট প্রত্যাহারের পর শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন। তবে সব শ্রমিক এখনো কাজে যোগ দেননি।
কাজে না ফেরা শ্রমিকদের পক্ষে চা শ্রমিক ফেডারেশনের সংগঠক অজিত রায় বলেন, শ্রমিকরা ১৪ দিন ধরে না খেয়ে আন্দোলন করছেন। অথচ রাতের অন্ধকারে ১২০ টাকায় কাজে ফেরার হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল! আমাদের ন্যায্য দাবি ৩০০ টাকা মজুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী যদি সরাসরি ভিডিও কনফারেন্সে আমাদের সঙ্গে কথা বলেন তবেই আমরা কাজে ফিরবো।

বাংলাদেশীয় চা সংসদের (বিটিএ) সিলেট ব্রাঞ্চ চেয়ারম্যান জিএম শিবলি বলেন, আমাদের চায়ের ভরা মৌসুম চলছে এখন। ঠিক এ সময়ে চা শ্রমিকদের কাজে ফিরে আসার এ উদ্যোগটি ইন্ডাস্ট্রির জন্য খুবই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। সবারই তাতে লাভ।
মজুরি ৩০০ টাকা করার দাবিতে গত ৯ আগস্ট থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত দুই ঘন্টা করে কর্মবিরতি পালন করে আসছিলেন চা শ্রমিকরা। কিন্তু তাদের এ দাবিতে মালিক পক্ষ সায় না দেওয়াতে ১৩ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে যান শ্রমিকরা।
তাদের আন্দোলন থেকে ফেরাতে দফায় দফায় বৈঠক চলে। গত শনিবার শ্রম অধিদপ্তরের মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠকের পর ১৪৫ টাকা মেনে নিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা।
কিন্তু তাতে বেঁকে বসেন শ্রমিকরা। তাদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। ওইদিন বিকেলে তারা আন্দোলন ফের আন্দোলন শুরু করেন। পরে রাতে সিলেট জেলা প্রশাসনেও বৈঠক হলেও শ্রমিকদের বিভক্তির কারণে কর্মবিরতি অব্যাহত রাখেন।
এ নিয়ে রোববার (২২ আগস্ট) দুপুরে চা শ্রমিকরা সিলেট এয়ারপোর্ট সড়ক অবরোধ করেন।পরে আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে সড়ক অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।

এরপর রোববার দিনগত রাতে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার এবং আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ শ্রমিকদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। কিন্তু ওই বৈঠক থেকেও কোনো ফলপ্রসু সিদ্ধান্ত আসেনি। বরং শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ে অটল থাকেন।
সর্বশেষ গতরাতে মৌলভীবাজারে প্রশাসনের সাথে বৈঠক শেষে আন্দোলন প্রত্যাহারের কথা জানান চা শ্রমিক ইউনিয়ন নেতারা। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, আপাতত ১২০ টাকা মজুরিতেই কাজে ফিরবেন শ্রমিকরা। তবে শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে নিজেদের দাবি জানাবেন।কিন্তু সোমবার সকালে চা শ্রমিকদের একটি পক্ষ ফের বেঁকে বসেন।তারা কাজে যোগ না দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। আরেকপক্ষ বেলা ১ টার দিকে শ্রমিকদের একাংশ কাজে যোগ দিতে বাগানে যান। তারা চা পাতা তুলতে শুরু করেছেন।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



