নতুন সিলেট প্রতিবেদক:: সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সদরের নুরপুরের এই বাড়িটিতে শৈশব কেটেছিল মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর। আলীশাস এই বাড়ির নির্মাণশৈলী নিজের মতোই করেছিলেন তিনি। বাড়ির প্রবেশদ্বারে পিতা মরহুম দেলোয়ার হোসেন চৌধুরীর নামে করেছেন দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলিতে গম্বুজ খচিত মসজিদ। মাটির নীচেও মসজিদটি সুবিস্তৃত। যে মসজিদে নামাজ আদায় করেন পুরো এলাকার মানুষ। পাশেই নারী শিক্ষার বিস্তারে মাহমুদ উস সামাদ-ফারজানা চৌধুরী স্কুল এন্ড কলেজ। রাস্তার আরেক পাশে ছোট্ট মক্তব রয়েছে তাঁর মায়ের নামে। সাত সকালে ওই মসজিদে আরবি শিক্ষাদান করা হয় শিশু-কিশোরদের।
পরপর তিনবার নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য কাজের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন। যে কারণে প্রতি বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাজধানী ঢাকা থেকে বাড়িতে গেলে দলীয় নেতাকর্মী থেকে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মোক্ত থাকতো তার দুয়ার। জনতার বিচরণ ছিল অবাদে। বিভিন্ন আবদার ও ফরিয়াদ নিয়ে যেতেন তার কাছে। যে কারণে জনতার কাছে জননন্দিত হয়ে ওঠেছিলেন এই সংসদ সদস্য।
করোনাকালে যখন অনেক সংসদ সদস্য এলাকাছাড়া। তখন এমপি সামাদ ঘটা করে খাবার নিয়ে হাজির হতেন অনেকের বাড়িতে। উপজেলা মাঠে বিশাল আয়োজন করে সাধারণ মানুষের হাতে খাদ্য সামগ্রি তুলে দিতেও দেখা গেছে তাঁকে।

মৃত্যুর আগে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সদরে কাইয়ার গুদাম বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ,উপজেলার ঘিলাছড়া জিরো পয়েন্টে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিস্তম্ভ করে দিয়ে অনুপ্রাণিত করেন মুক্তিযোদ্ধাদেরও।শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য উপজেলা সদরে কুশিয়ারা নদীর তীরে করে গেছেন শেখ রাসেল শিশু পার্ক। বৃদ্ধদের জন্য প্রস্তাবিত শেখ রাসেল প্রবীণাঙ্গন করার উদ্যোগ নিলেও সম্পন্ন করে যেতে পারেননি।
ফেঞ্চুগঞ্জ কুশিয়ারা নদীর সেতু পার হয়ে নিজের নামে করা আল্লাহু চত্বর করে উদ্বোধনী বক্তৃতায় বলেছিলেন-আমি মারা যাবার পর এখান দিয়ে যারাই যাবেন, এই নামটি উচ্চারণ করলে মৃত্যুরে পর সওয়াব আমার কবরে যাবে। তাঁর মৃত্যুর পর সেসব কথা এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে।
এছাড়া এলাকায় রাস্তাঘাটের শতভাগ উন্নয়ন শেষ করে যেতে না পারার আক্ষেপ পেয়ে বসেছে নির্বাচনী এলাকার লোকজনকে। তিনি থাকলে হয়তো সেসব কাজ হতো! অভিভাবকহীন হওয়ায় এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন নির্বাচনী এলাকার লোকজন।
উপজেলার হাকালুকির তীরে জিরো পয়েন্ট পর্যটন কেন্দ্রে অত্যাধুনিক নির্মাণ শৈলীতে রিসোর্টের কাজও অসমাপ্ত অবস্থায় রেখে গেছেন এমপি সামাদ। উপজেলার জেটিঘাট সড়কটির কাজ শুরু করেছিলেন মাত্র। তার আগেই করোনা আক্রান্ত হয়ে পরপারে পাড়ি জমান তিনি। এই অসমাপ্ত কাজ এখন হবে কিনা, এ নিয়ে দ্বিধায় উপজেলার পালবাড়ি এলাকার লোকজন। স্থানীয় বাসিন্দা নিজাম উদ্দিন বলেন, এমপি সামাদের স্থলাভিষিক্ত কে হবেন। তিনি এসব অসমাপ্ত কাজ করবেন কিনা, সেই সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
উপজেলা যুবলীগের সভাপতি শাহ মাশার আহমদ বলেন, আমরা অভিভাবক হারা হয়ে গেলাম। তাঁর নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগ ও অংগসংগঠনকে গুছিয়ে দিয়ে পরপারে চলে গেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্তও এলাকার উন্নয়নে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় দায়িত্ব পালন করে গেছেন। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ব্যতিরেকেও শাহজালাল (র.) সারখানা নির্মাণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। শতভাগ বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নিজের অবদান রাখতে করে গেছেন কুশিয়ারা পাওয়ার প্লান্ট।
ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিব উদ্দিন বাদল বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও অত্যান্ত আস্থাভাজন ছিলেন মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী। যে কারণে শেখ রাসেল শিশু কিশোর পরিষদের মহাসচিবের পদটি যেনো তাঁর জন্যই বরাদ্দ ছিল। মৃত্যুর আগেও শেখ রাসেলের নামে এলাকায় বেশ ক’টি ফুটসাল টুর্নামেন্ট চালু করেন তিনি। তাঁর অসুস্থতার খবরে সেসব টুর্নামেন্ট স্থগিত রাখা হয়।
উপজেলার ঘিলাছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আবুল লেইস চৌধুরী বলেন, আমরা একজন সজ্জন ব্যক্তিকে হারালাম। তিনি এলাকায় অনেক উন্নয়ন করে গেছেন। কিন্তু কিছু না বলেই অকালে চলে গেলেন।
আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, এমপি সামাদ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার পর আমার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ছিল। ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে তাঁর সহচর্য পেয়েছি। সংসার জীবন শুরুর সময় অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা থেকে যখন দেশে আসি। তখন তিনি আমাকে রিসিভ করে বাসায় আশ্রয়দাতা দিয়েছিলেন। তার বাসা থেকে গিয়েই দলীয় সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মিষ্টি নিয়ে গিয়ে দেখা করি। রাজনৈতিক সকল কর্মকান্ডে এমপি সামাদের সফল অংশগ্রহণ ছিল। প্রতিটি সভায় তিনি বক্তব্য না রেখে বলতেন আমি মোনাজাত করবো। তিনি সাদা মনের মানুষ ছিলেন। তিনি নির্বাচনী এলাকায় যেসব উন্নয়ন করে গেছেন, তার সেই স্মৃতিগুলো আমরা ধরে রাখবো।
স্থানীয়রা বলেন, সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর ইচ্ছা ছিল অবসর জীবন বাড়িতে কাটাবেন। বলেছিলেন-‘আমি যখন রিটায়ার্ড কররো, এই বাড়িতেই থাকবো। তখন সকালে উঠে জানালা খুলে যেনো মসজিদ দেখতে পাই। পুকুর ঘাটে হাওয়া খানায় বসেও যেনো মসজিদ দেখতে পাই।
আলীশান সেই বাড়ি আছে। নান্দনিক শৈলীতে সাজানো ঘর গুলোতে এখন সুনসান নিরবতা। সানবাধা পুকুর ঘাট ও হাওয়াখানায় বসবেন না তিনি। হাওয়াখানায় মার্বেল পাথরে লিখা-‘একদিন আমরা কেউ থাকবো না থেকে যাবে মোদের স্মৃতি’ পিতা-মাতা, সাত ভাই ও চার বোনের নাম লিখে যান সেই পাথরে। সত্যি, সবই পড়ে রইল। নেই কেবল তিনি। সেই আক্ষেপ স্বজনদেরও।
শুক্রবার (১২ মার্চ) সন্ধ্যায় বাড়ির সামনে নিজের হাতে দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলিতে করা মসজিদের পাশেই নির্ধারণ করে যাওয়া কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হলো। এরআগে বিকাল সোয়া ৫টায় ফেঞ্চুগঞ্জের কাশিম আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মরহুমের জানাযা সম্পন্ন হয়। এতে লাখো মানুষ অংশ নেন। চোখের জলে প্রিয় ব্যক্তিত্ব, প্রাণের মানুষ মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীকে শেষ বিদায় জানান নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ।
গত ৮ মার্চ সকালে তার করোনার নমুনা দিলে বিকেলে করোনা পজিটিভ আসে। এদিন বিকেলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে রাজধানী ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
শুক্রবার বেলা ১২ টায় বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে তাঁর মরদেহ ফেঞ্চুগঞ্জের নুরপুরে গ্রামের বড় বাড়িতে নেওয়া হয়।দিনভর দলীয় নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ মাহমুদ উস সামাদের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এসময় স্বজন, নেতাকর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সাংসদ মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী মাত্র ৬৬ বছর বয়সে মারা যান। তিনি ১৯৫৫ সালের ৩ জানুয়ারি ফেঞ্চুগঞ্জের নুরপুর সম্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী এবং মাতা আছিয়া খানম চৌধুরী।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



