সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ গবাদিপশু নিয়ে তীব্র সংকটে পড়েছেন। বন্যার পানি বাড়িঘরে ওঠায় নিজেদের থাকা-খাওয়া এলোমেলো হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে গবাদিপশু সংরক্ষণ, গবাদিপশুর খাদ্য জোগানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, শাল্লা, শান্তিগঞ্জ ও ছাতক উপজেলায় এ সংকট দেখা গেছে। ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে এসব ইউনিয়নের বেশির ভাগ মানুষের বাড়িঘরে এখনো পানি। গবাদিপশুর জন্য জমানো খড় পানিতে ভিজে পচে গেছে। এই কয়েক দিনে ধানের গুঁড়ার সঞ্চয়ও শেষ হয়ে গেছে।
তাহিরপুর উপজেলার কামরুল ইসলাম বলেন, ‘মাইনসের বাড়িঘরে পানি। অনেকের নিজের খাইবারই নাই। নিজর খানি (খাবার) জুগাইমু না গরুর খানি জুগাইমু। যে অবস্থায় গরু পালরাম (লালন–পালন করা হচ্ছে) এটা কেউরে বুঝাইবার মতো নায়। কোনো রকম গুরাগারা, পচা খড় খাইরা না খাইরা চলছে। গরুর তো কোনো অবস্থা নাই। গরু হালকা পড়ি গেছে।’
কামরুল ইসলাম ৫টি গরু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। তাঁর বাড়িতে পানি থাকায় বাড়িসংলগ্ন একটি উঁচু সেতুর কাছে নিয়ে গরুগুলো রেখেছেন। সেখানে আরও ১০ থেকে ১২টি পরিবারের গরু একসঙ্গে রাখা হয়েছে। পালা করে রাতে গরুর কাছে থাকছেন তাঁরা। বর্ষাকালে ঘাসের সংকট থাকে। যাঁদের নৌকা আছে, তাঁরা হাওর থেকে শাপলা-শালুক সংগ্রহ করে গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন। তবে অরবিন্দ বিশ্বাসের নৌকাও নেই। তাঁর ছয় সদস্যের পরিবারে তিনিসহ তিনজন প্রতিবন্ধী। স্বাভাবিক কাজ করতেও তাঁর সমস্যা। বন্যার কারণে এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে তাঁর জন্য। এর মধ্যে গবাদিপশুর খাদ্য কীভাবে জোগাড় করবেন, সেটা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

কামারগাঁও গ্রামের জুয়েল কান্ত দাস বলেন, ‘দুই বস্তা গুঁড়া আছিল। এই কদিন তুরা তুরা করি গরুরে খাওয়াইছি। ধান কুটাইতাম পাররাম না। ধান কুটাইলে কিছু গুঁড়া বারইতো। পেনাটেনা (কচুরিপানা) কিছু কাটি আনি। ঘাসপাতও নাই। বাড়িত আটুপানি। এরপরও বাড়িতই গরু রাখরাম। চোরের ডরে বেশির ভাগ মানুষই কষ্ট করি বাড়িতে গরু রাখছে।’
জুয়েল কান্ত দাস বলেন, ‘আমরা কেউর কাছে ত্রাণ চাইরাম (চাইছি) না। তারপরও মাইনসে আমরারে কিছু ত্রাণ দেরা (দিচ্ছেন)। কিন্তু গরুরে তো কেউ কিচ্ছু দের (দিচ্ছে) না।’
কামারগাঁও গ্রামের সেতুর কাছে গিয়ে অনেকগুলো গরু বেঁধে রাখতে দেখা গেছে। এসব গরুকে কেউ কচুরিপানা এনে দিয়েছেন। কোনো গরুকে শাপলাপাতা দেওয়া হয়েছে। যদিও সব গরু কলাগাছ খায় না। তারপরও কোনো কোনো গরুর সামনে কলাগাছ কেটে টুকরো টুকরো করে রাখা হয়েছে।
ছাতকের সামসুল আলম বলেন, আমি কুরবানী বেচার জন্য ১০ টি গরু নিয়ে বিপাকে পড়েছি। একদিকে যেমন ঘাস পাওয়া কঠিন তেমনী খড় গোরা পাওয়া যাচ্ছে না। গরুগুলো বাজারে বেচিলিলে আমার কষ্ট সফল হবে। হাওরপাড়ের বেশির ভাগ মানুষ কৃষিজীবী। প্রতিটি পরিবারে দুই-চারটি করে গরু আছে। গরুর খাদ্যসংকট এখন চরম হয়ে উঠেছে। মানুষের মজুত করে রাখা খড় নষ্ট হয়ে গেছে। এখন পানি একটু কমলেও বাড়িঘর থেকে পানি নামেনি। রাস্তাঘাটও এখনো ডুবে আছে। মানুষকে ত্রাণ দেওয়ার পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য নিয়েও এখন ভাবা দরকার।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় বন্যাকবলিত এলাকায় ৪৩ হাজার ২২ গরু, ৩ হাজার ৭৭৬ মহিষ, ১৬ হাজার ৪৯৫ ছাগল, ৪ হাজার ৫৭৭ ভেড়া, ৩ লাখ ১৪ হাজার ৪৫৯ মোরগ ও ১ লক্ষ ২৫ হাজার ১৮১টি হাঁস আছে।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



