চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নে বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন লাগার পর ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৬ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মী বলে জানা গেছে।
তবে দগ্ধ ও আহতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে বলে জানিয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
এ ঘটনায় আহত ১৩৫ জন চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন রোববার (৫ মে) মধ্যাহেৃ এমনটি নিশ্চিত হওয়া গেছে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন সূত্রে।
জানা গেছে, শনিবার রাত ৯টার লোড-ইয়ার্ডে রাসায়নিক থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে ভয়াবহতা সম্পর্কে বুঝে উঠতে পারেনি ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ও ডিপোর কর্মীরা। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অনেকটা কাছ থেকে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিলেন। ডিপোর কর্মীদের কেউ কেউ আগুনের দৃশ্য ভিডিও করছিলেন। রাত ১১টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হলে তাদের অনেকেই আগুনে তলিয়ে যান।
ডিপোতে আগুনে চোখে মারাত্মক আঘাত পাওয়া রাশেদুল ইসলাম বলেন, তিনি ডিপোর আইসিডি-২ শাখায় কর্মরত আছেন। রাতে ডিউটি না থাকলেও আগুন লাগার খবর পেয়ে পাশের কোয়ার্টার থেকে অন্যদের নিয়ে ছুটে আসেন তিনি।
রাশেদুল বলেন, ‘আগুনের দৃশ্য দেখছিলাম। এমন সময় বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে হাতে থাকা মোবাইলটিও হারিয়ে যায়। আগুনের তাপে চোখে মারাত্মক আঘাত পেয়েছি।’ পরে অন্য সহকর্মীরা তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
এদিকে আগুন আট ঘণ্টার বেশি সময় পরও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, এখনও উদ্ধার অভিযান চলছে। ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিট ভয়াবহ এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করছে। কোনোমতেই আগুনের তীব্রতা কমছে না। অনেকটা অসহায় পড়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। আগুন নেভাতে আশপাশের জেলা থেকে নতুন নতুন ইউনিট যোগ দিচ্ছে।

সহকর্মীর মরদেহ উদ্ধারের পর অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মী।
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে চট্টগ্রামে অবস্থানরত সকল চিকিৎসককে চমেক হাসপাতালে এসে সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়েছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. ইলিয়াছ চৌধুরী।
ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক নিউটন দাশ বলেন, বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট কাজ করে। পরে ইউনিট আরও বাড়ানো হয়। এখন ২৫টি ইউনিট কাজ করছে। ডিপোতে আমদানি ও রফতানির বিভিন্ন মালবাহী কনটেইনার আছে বলে জানা গেছে।
শনিবার (৪ জুন) রাত ১০টার দিকে আগুন লাগে। রোববার বেলা সোয়া ১২টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

অগ্নিকান্ডস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, আগুন লাগার পর বেশ কয়েকটি কনটেইনারে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। কনটেইনারে রসায়নিক থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিষ্ফোরণে ঘটনাস্থলের এক কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত অনেকেই দগ্ধ হয়েছেন। ওইসব এলাকার সকল গ্লাস ফেটে গেছে।
সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুমন বণিক বলেন, বিস্ফোরণে তাদের থানার কনস্টেবল তুহিনের এক পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আরও অন্তত ৯ কনস্টেবল, ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মোতাহার হোসেন এবং শিল্প পুলিশের একাধিক সদস্য আহত হয়েছেন। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসের ২১ সদস্য আহত হয়েছেন।

হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা সহযোগীতায় রেড ক্রিসেন্ট কর্মীরা।
ফায়ার সার্ভিসের ডিজি মাইনুদ্দিন বলেন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড ছিল বলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আমাদের বেগ পেতে দেরি হচ্ছে। এছাড়া উৎসুক জনতার ভিড়ে আমাদের বেগ পেতে হচ্ছে। বিষ্ফোরণে ফায়ার সার্ভিসের ২১ জন সদস্য এখন পর্যন্ত আহত হয়েছেন। ৬ জনকে সিএমএইচ ও বাকি ১৫ জনকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
চমেক হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, ৫২ জন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন এবং অর্থোপেডিক বিভাগে ভর্তি রয়েছে ১০ জন। তাদের বেশিরভাগেরই শ্বাসনালী পোড়া। তাদের বাঁচাতে আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি।

রোববার ভোররাতে অগ্নিকাণ্ডস্থলে জনতার ভীড়।
এদিকে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালজুড়ে স্বজনদের আহাজারি চলছেই। ভারী হয়ে উঠেছে এখানকার বাতাস। কেউ রয়েছেন স্বজনের খোঁজে, কেউ মরদেহ শনাক্তে ব্যস্ত।
নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত চারজনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে জানিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলাউদ্দিন তালকুদার বলেন, তারা হলেন, বাঁশখালীর মমিনুল হক (২৪), মো. মহিউদ্দীন (২৪), ভোলা জেলার হাবিবুর রহমান (২৬) ও বাঁশখালীর রবিউল আলম (১৯)।
এদিকে, শনিবার (৪ জুন) রাত সাড়ে ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকার বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ইউনিট আরও বাড়ানো হয়। ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিটের ১৮৩ কর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

বিস্ফোরণে তছনছ ঘটনাস্থল। ছবি-সংগৃহিত
এছাড়া নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ করছেন।
সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকার বিএম কনটেইনার ২৪ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটি মূলত পণ্য রপ্তানিতে কাজ করে। এখান থেকে পণ্য রপ্তানির জন্য কনটেইনারগুলো প্রস্তুত করে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হয়। ৩৮ ধরনের পণ্য রপ্তানিতে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। ঘটনার সময় সেখানে ৫০ হাজার কনটেইনার ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অগ্নিকাণ্ডের সময় অন্তত ২০০ শ্রমিক সেখানে কাজ করছিলেন প্রাথমিকভাবে জানা গেলেও ঠিক কত সংখ্যক মানুষ তখন ছিলেন, তা এখনো সঠিকভাবে জানা যায়নি।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



