হাওরের ফসল বাঁচাতে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ রক্ষায় কাজ করছেন কৃষক। ১৮ দিনের বেশি সময় ধরে রাত-দিন কাজ করে ক্লান্ত তাঁরা। তবু সব বাঁধ বাঁচানো গেল না। বাঁধ ভেঙে বা উপচে পড়া পানিতে তলিয়ে গেছে বেশ কয়েকটি হাওরের ফসল।
অন্য হাওরগুলো যেকোনো সময় তলিয়ে যেতে পারে। এই অবস্থায় পুরোদমে ধান কাটায় নেমে পড়েছেন কৃষক। পরিবারের সদস্যরাও বসে নেই।
এদিকে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের হুরামন্দিরা হাওরের সাতবিলা বাঁধ রবিবার রাতে ভেঙে যায়। এতে ৫০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। কিশোরগঞ্জের ইটনার মৃগা ইউনিয়নের ছিমত্খালী বাঁধ, অরুঙ্গা বাঁধ ও সিংরা বাঁধ উপচে হাওরের কয়েক শ একর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায় তিনটি হাওরের শতাধিক হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। পানি বাড়তে থাকলে তিন হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কৃষকের। তাই কৃষকরা আধাপাকা ধান কাটা শুরু করেছেন।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে বোরো ফসল বাঁচাতে বাঁধে বাঁধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা। উপজেলার প্রধান নলুয়ার হাওরের বেতাউকা গ্রামের পাশে ১৪ নম্বর প্রকল্পের মাটি রবিবার রাতে ধসে যায়। গতকাল সোমবার সকাল থেকে বাঁধটি রক্ষায় কাজ চলছে।
একইভাবে নলুয়ার হাওরের ডুমাখালি এলাকার ৮ ও ৯ নম্বর প্রকল্পের ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধে রবিবার রাতে ফাটল দেখা দিলে নলুয়ার হাওরে ১০ হাজার হেক্টর জমির ফসল হুমকিতে পড়ে। একই রাতে সৈয়দপুর শাহারপাড়া ইউনিয়নের ঝিলকার হাওরের ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দেয়। বাঁধ রক্ষায় কয়েক গ্রামের দুই শতাধিক মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ শুরু করেন। ভোররাতে সৈয়দপুর শাহারপাড়া ইউনিয়নের তেঘরিয়ার হাওরের ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দেয়।
গতকাল সকালে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, মুক্তিখলা গ্রামের কৃষক আব্দুল মালিক শ্রমিক না পেয়ে দু-তিনজন নিয়ে ধান কাটছেন। তিনি ও দুই শ্রমিক ধান কাটছেন। তাঁর দশম শ্রেণিপড়ুয়া মেয়ের রুবিনা আক্তার ধানের মুঠো হাওরের জাঙ্গালে নিয়ে রাখছে। দ্বিতীয় শ্রেণিপড়ুয়া এক নাতনিকেও ধানের আটি টানতে দেখা যায়।
আব্দুল মালিক বলেন, ‘দিনমাদান বালানা। গাঙোও ফুলতেছে। বান্দ বাঙ্গে বাঙ্গে অবস্থা। অখন বান্দের আশা বাদ দিয়া আউরো ফায়ফুরুতা লইয়া নামছি। দেড় শ শতক জমিতে ধান লাগিয়েছি। এই ধান পানিতে তলিয়ে গেলে না খেয়ে থাকতে হবে। ’
দুপুরে দেখার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, শাফেলা গ্রামের কৃষক নূর হোসেন হাওরে ধান কাটছেন। নূর হোসেন বলেন, ‘খরচার হাওরের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধে টানা কাজ করেছি। এখন চারদিকে হাওরের বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়া দেখে নিজের ক্ষেতের ধান কাটতে এসেছি। ’
কৃষক বশির মিয়া বলেন, বিভিন্ন এলাকায় হাওরের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার দৃশ্য দেখে কৃষকরা ধান কাটার যুদ্ধে নেমে পড়েছেন। হাওরে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন স্ত্রী-কন্যা ও স্কুলপড়ুয়া সন্তানদেরও।
সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক ও জেলা বাঁধ রক্ষা ব্যবস্থাপনা ও তদারকি কমিটির সদস্য মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘কৃষক ফসলের মায়ায় বাঁধ রেখে এখন হাওরে নেমেছেন। তাঁরা ধান কেটে তোলার চেষ্টা করছেন। আমরা একই সঙ্গে বাঁধ রক্ষা ও ধান কাটার কাজ তদারকি করছি। ’
দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের কলিয়ার কাপন গ্রামের কৃষক নেতা মির্জা আনিসুল ইসলাম লিটন বলেন, ‘সরকারি হিসাবে এই হুরামন্দিরা হাওরে এক হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। কিন্তু এই হাওরের মধ্যে পাশের গ্রামের কয়েকটি ছোট ছোট হাওর রয়েছে।
যে জমিগুলো চাপতি ও নলুয়ার হাওরের কান্দাসংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামের পাশে। যেখানে আরো চার-পাঁচ শ হেক্টর জমি আবাদ হয়েছিল। এই বাঁধ ভেঙে শুধু হুরামন্দিরা হাওরই নয়, অন্যান্য ছোট ছোট হাওরের ফসলও তলিয়ে গেছে। আমাদের হিসাবে প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে, যা কোনোভাবেই কৃষকরা আর সংগ্রহ করতে পারবেন না। ’
কৃষক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘আমি এই হাওরে তিন একর জমির ধান চাষ করেছিলাম। মাত্র এক একর জমির ধান কেটেছি। আমার মতো অন্য সব কৃষকেরই একই অবস্থা। আমরা কেউ অর্ধেক ধানই তুলতে পারিনি। বাঁধটি ভেঙে আমাদের পাকা ধান তলিয়ে নিয়েছে। ’
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, এ পর্যন্ত জেলায় আট হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে।
গতকাল দিনভর কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, মিঠামইন ও ইটনার প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, ইটনার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ফসল কাটা হয়ে গেছে। প্রশাসনের মাইকিং চলছে। তারা ৮০ শতাংশ পাকলেই কেটে ফেলার জন্য তাগিদ দিচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, শ্রমিকের অভাবে ফসল পাকলেও কাটা মুশকিল হবে। তবে হাওরপারের বাজিতপুর উপজেলার পাটুলী ঘাট ও করিমগঞ্জের চামড়াঘাট দিয়ে উজান এলাকা থেকে ধান কাটা শ্রমিকরা আসছেন বলে জানা গেছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, হাওরে পর্যাপ্ত কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার ও রিপার দেওয়া হয়েছে। সে কারণে এবার ফসল কাটার সমস্যা হবে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ছাইফুল আলম জানান, গতকাল পাহাড়ি ঢলের পানি বিপত্সীমার কাছাকাছি চলে আসে। এই মুহূর্তে হাওরে পাঁচ-সাত শতাংশ ধান পেকে গেছে, যা এখনই কাটার উপযুক্ত। সব মিলিয়ে ৬৫ শতাংশের মতো বোরো জমি এখনো পাকার বাকি আছে।
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘লাখাই ইউনিয়নের বোরো জমিগুলো তুলনামূলক নিচে। পরিদর্শনে দেখেছি, ধানগাছগুলো পানির নিচে তলিয়ে যায় যায় অবস্থা। এ অবস্থায় দ্রুত ধান কাটার জন্য সব কৃষককে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



