এ বছর কিতা খাইয়া বাঁচমু? পানিতে ডুবে গেছে জমির সব ধান। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন। হটাৎ করে পানি এসে আমাদের হাওর ডুবে আমরা কখনো ভাবিনি। আসলে আমাদের ভাগ্য খারাপ। ভেঙে যাওয়া বাঁধের পাশে বসে আহাজারী করেছিলেন সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার ঘুঙ্গিয়ারগাঁও গ্রামের কৃষক কিতেশ বাবু । ফলস্বরূপ বাঁধ ভেঙে পানিতে তলিয়ে যাবে কৃষকের স্বপ্নের ফসল। কিতেশ বাবুরা সেই ভাঙা বাঁধের গোড়ায় বসে আহাজারি করবে আর এই দেশে কোনো চোরের ওই বিচার অয় না বলে হাত তুলবে আকাশের দিকে।
সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত না হলেও ভারতের মেঘালয়ে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে একের এক এক বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে হাওরের বোরো ফসল। ফসল তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাওরপাড়ের কৃষক।
ভাটির দেশ সুনামগঞ্জে বাঁধ ভেঙে হাওরের ধান তলিয়ে যাওয়ার চিত্র নতুন নয়। গত ৮ দিনে সুনামগঞ্জের কয়েকটি উপজেলার ১৪টি হাওর তলিয়ে গেছে। বাকিগুলো আছে মারাত্মক ঝুঁকিতে।
সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত কম হলেও সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওর এলাকায় পানি বেড়েই চলেছে। যাদুকাটা, সুরমা, বৌলাই, কুশিয়ারা, রক্তি, মনাই, সুমেশ্বরী, কালনী নদীর পানি বাড়ছে দ্রুত বেগে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁধে দেয়া হচ্ছে মাটিভর্তি বস্তা ও বাঁশ।
প্রায় প্রতিটি হাওরের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে স্থানীয় কৃষক স্বেচ্ছায় এভাবে বাঁধ মেরামতের কাজ করছেন। রোজার মধ্যেও রাতদিন পড়ে আছেন বাঁধের গোড়ায়। তাতেও কাজ হচ্ছে না। প্রবল পানির চাপে নড়বড়ে বাঁধগুলো নিমিষেই ভেঙে যাচ্ছে।
সরকারি তথ্যমতে এ বছর সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলার ৫২টি হাওরে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ টন। জেলার ২৫ লাখ মানুষের অধিকাংশ নির্ভরশীল এই হাওরের ওপর। ফসলের যাতে কোনো রকমের ক্ষতি না হয়, এজন্য বাঁধ সুরক্ষাসহ ফসল রক্ষার যাবতীয় কাজের জন্য সরকার থেকে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়া হয়। এ বছর জেলায় বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ আসে। কিন্তু এত বিশাল বাজেট আসলেও কাজের কাজ কিছুই হয় না। বরাদ্দ আসলে টাকা নিয়ে চলে হরিলুট কাণ্ড। সুবিধাভোগীদের পকেট ভারী হয়। তাসের নোটের মতো ভাগ হয় কৃষকের ফসল রক্ষা বাঁধের টাকাগুলো।

২০১৭ সালে বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জের অধিকাংশ হাওর পানিতে তলিয়ে যায়। পরবর্তীতে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার প্রেক্ষিতে ঠিকাদার ও বাঁধ সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়। পাঁচ বছর হয়ে গেলেও যার একটির বিচারও হয়নি। অভিযুক্তদের অনেকেই মামলা থেকে অব্যাহতি পান।
পরবর্তীতে সরাসরি ঠিকাদারের কাছে না দিয়ে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য তৈরি করা হয় পিআইসি সিস্টেম। পিআইসিতে যেসব নীতিমালা অনুসরণ করার কথা বলা হয়, তার কণা পরিমাণ ও বাস্তবে কার্যকর হয় না। যে কারণে কথিত এই সিস্টেমও কাল হলো অভাগা কৃষকদের জন্য। খোঁজ নিলে দেখা যাবে জেলার শতকরা একটা পিআইসি’র কাজও ঠিকমতো হয় না। ফলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের চাপে হাওরের নড়বড়ে বাঁধগুলো সহজেই ভেঙে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাঁধ সিন্ডিকেট, কৃষি অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার জন্য বছরের পর বছর বাঁধ ভেঙে ফসল নষ্টের ঘটনা হলেও আদৌও তাদের কাউকেই আইনের আওতায় এনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় না। সব ধরনের তথ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও চিহ্নিত এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় হাওর অঞ্চলে কৃষকের কান্না দিনদিন বেড়েই চলছে।
বছরের পর বছর বাঁধ ভেঙে হাওরের ফসল নষ্ট হবার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তার মধ্যে নদী ভরাট, দখল -দূষণ অন্যতম। যে কারণে এসব সমস্যাগুলো আগে সমাধান করা উচিত। প্রভাবশালীদের কাছ থেকে নদীকে রক্ষা করতে হবে। পুরোপুরি দখল-দূষণ বন্ধ করে নদীর সীমানা নির্ধারণ করে দ্রুত ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের খাদ্য চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করে সুনামগঞ্জের হাওরের ফসল। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পারলে এর পানির ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। হাওরের ফসল নষ্টের এই ভয়ঙ্কর অভিশাপ থেকে স্থায়ী সমাধান আসবে। এটা সবাই বোঝেন। তারপরও কিছু মানুষের পকেট ভারী করার জন্য বছরের পর বছর ভুল সিন্ধান্ত নেয়া হয়। যার খেসারত দেয়া লাগে দরিদ্র কৃষকদের।
গেল ২-৩ বছর এতটা বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কৃষক সহজেই তাদের ফসল ঘরে তুলতে পেরেছেন। পিআইসি’র টাকায় বাঁধের কাজ না হলেও কোনো সমস্যা হয়নি। কার পকেটে কত টাকা গেল এনিয়েও কারোরই কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু এবার আগাম বৃষ্টির ফলে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় ফের উঠে আসছে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র।
জগন্নাথপুরের কৃষক গনেশ বাবু বলেন, আমাদের সবকটি হাওর পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন আমরা বড় অসহায় আছি কিন্তু সরকার আমাদের সাহায্য সহযোগীতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। তাই আমরা কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছি। আমারা কখনো ভাবিনি বৈশাখের শুরুতে পানি এসে আমাদের সব ফসলি জমি তুলিয়ে যাবে। একের পর এক হাওর পানিতে ডুবে যাচ্ছে।
এদিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলার বেশ কিছু স্থানে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে ধারণা করা হচ্ছে।
রোববার (১০ এপ্রিল) বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এমন তথ্য জানানো হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা হতে প্রাপ্ত বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যা সম্পর্কিত বিশেষ প্রতিবেদন এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং অন্যান্য বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাসমূহ থেকে প্রাপ্ত বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চলতি সপ্তাহে স্বাভাবিক থেকে বেশী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, রোববার (১০ এপ্রিল) থেকে (১৭ এপ্রিল) পর্যন্ত উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতের আসাম (বরাক অববাহিকা) এবং মেঘালয় প্রদেশের স্থানসমূহে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা, কুশিয়ারা, যদুকাটা, লুভাছঢ়া, সারিগোয়াইন, ধলাগাং, পিয়াইন, ঝালুখালী, সোমেশ্বরী, ভুঘাই-কংস, ধনু-বাউলাই নদ-নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়ে কতিপয় পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে এই সময়কালের শেষার্ধে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলার কতিপয় স্থানে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



