আর শনিবার (৫ মার্চ) স্ত্রীকে নিয়ে শশুর বাড়ি ঠাকুরের মাটি এলাকায় বেড়াতে গিয়ে নিখোঁজ হন রাজমিস্ত্রী ডালিম আহমদ (২২)।তিনি জৈন্তাপুরের চিকনাগুল ইউনিয়নের ঘাঠেরচটি গ্রামের বাচ্চু মিয়ার ছেলে।
গত সোমবার (৭ মার্চ) জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের ঘাটেরচটি এলাকায় তারেক হাজির মৎস খামার থেকে পরিচয়হীন মরদেহ উদ্ধারকালে এটি নিখোঁজ ডালিমের মরদেহ বলে দাবি করেন স্বজনরা। পুলিশও নিখোঁজের পরিবারের কথায় বিশ্বাস করে ময়না তদন্ত শেষে মরদেহ হস্তান্তর করে। এরপর ইসলামিক রীতি অনুসারে তার দাফনও করা হয়।
কিন্তু পুলিশ গোলকধাঁধাঁয় পড়ে মরদেহের ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে। ডালিমের ভোটার কার্ডের সঙ্গে মরদেহের ফিঙ্গার প্রিন্ট মিলেনি। তাহলে যাকে দাফন করা হলো-সে কে? এমন ঘুরপাকে পড়ে শুরু হয় ডালিমের সন্ধ্যান। মঙ্গলবার বিকেলে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও জৈন্তাপুর থানা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। কর্মকর্তারা থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন আশপাশের এলাকা খোঁজে দেখতে। খোঁজতে গিয়ে রাত ১০টার দিকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নেতৃত্বে পুলিশ ডালিমের খোঁজে বের হয়। এরপর রাত ১টার দিকে ঘাঠেরচটি নায়াটিলা জামে মসজিদ সংলগ্ন একটি বিদ্যুতের খুঁটিতে রক্তের ছোপ দেখতে পায় পুলিশ।
এই রক্তের সুত্র ধরে মসজিদ সংলগ্ন এমআর হাউজিংয়ের জমিতে মাটি চাপা অবস্থায় হাত বের করা একটি মরদেহ দেখতে পান। খবর দেওয়া হয় সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিটকে। তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহের ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করেন। এরপর নিখোঁজ ডালিম আহমদের সঙ্গে মরদেহের ফিঙ্গার প্রিন্টের মিল পেয়ে নিশ্চিত হতে পারেন এটি ডালিমের মরদেহ।
রাত ২টার দিকে মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ সুরতহাল করে। সুরতহালে উঠে আসে হত্যার প্রাথমিক বর্ণনা। ডালিমকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। দেহে আঘাতের চিহ্ন ছিল। মাটির খুঁড়ে মস্তক বিচ্ছিন্ন পাওয়া যায়। পুলিশের ধারনা দুর্বৃত্তরা ডালিমকে গলা কেটে, হাত-পায়ের রগ ও কোমর কেটে হত্যার পর মাটিচাপা দিয়ে রাখে। ঘটনাস্থল থেকে একটি ছোরাও জব্দ করা হয়। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। ময়না তদন্তে শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলে প্রকৃত ডালিমের মরদেহ স্বজনরা নিয়ে দাফন করেন।
এদিকে, মাছের খামার থেকে উদ্ধার হাত-পা বাধা মরদেহটি শাহপরান এলাকা থেকে নিখোঁজ শম্ভু দেবনাথের সনাক্ত করা হয়। তাকে নিখোঁজ ডালিম আহমদ ভেবে মরদেহ উদ্ধার করে দাফন করা হয়।
সিলেট জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. লুৎফর রহমান বলেন, মৎস খামার থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহটি ছিল শম্ভু দেবনাথের।আমরা তা পরে নিশ্চিত হতে পেরেছি। কিন্তু ডালিমের স্বজনরা মরদেহ তাদের স্বজনের বলে ময়না তদন্তের পর নিয়ে দাফন করেন। মরদেহ পচে গলে যাওয়ায় সনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না। কেবল ধারণা থেকে তারা সেটি ডালিমের মরদেহ বলে দাবি করেছিলেন। তবে হাউজিংয়ের জমি থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহ রাজমিস্ত্রী ডালিম আহমদের। উভয় মরদেহ সনাক্ত হয় ফিঙ্গার প্রিন্টে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শনিবার (৫ মার্চ) ডালিম আহমদ স্ত্রীকে নিয়ে শশুর বাড়ি ঠাকুরের মাটি এলাকায় বেড়াতে যান। সেখান থেকে রাতে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলেও তিনি আর বাড়ি ফিরেননি। বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের লোকজন তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। নিকট আত্মীয়সহ সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজ নিয়ে তাঁর কোনো রকম সন্ধান মেলেনি। এমতাবস্থায় ডালিমের বাবা বাচ্চু মিয়া রোববার (০৬ মার্চ) জৈন্তাপুর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়রি (জিডি) করেন।
এদিকে, এসএমপির শাহপরান (র.) থানার (ওসি-তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য বলেন, শম্ভু দেবনাথ অত্র থানাধীন বটেশ্বর সেনানীবাস সংলগ্ন সোয়াবহর এলাকায় মামার বাড়িতে থাকতেন ১৬ বছর ধরে। এখানে তিনি গরু চরানোর কাজ করতেন। গত ৪ মার্চ গরু নিয়ে বেরিয়ে গেলেও আর ফিরে আসেননি। তার নিখোঁজের ঘটনায় শম্ভুর মামা পরিমল দেবনাথ থানায় সাধারণ ডায়েরী করেন।পরে তার মরদেহ ঘাটেরচটি তারেক হাজির মৎস খামারে পাওয়া গেছে জানতে পেরেছেন। ওই ঘটনায় জৈন্তাপুর থানায় মামলা হবে বলেন তিনি।
এ ব্যাপারে জৈন্তাপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম দস্তগীর আহমেদ বলেন, ধারনা করা হচ্ছে দুর্বৃত্তরা ডালিমকে গলা কেটে, হাত-পায়ের রগ ও কোমর কেটে হত্যার পর মাটিচাপা দিয়ে ফেলে যায়। ঘটনাস্থল থেকে একটি ছোরাও জব্দ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শ্বশুড়ালয়ের আটককৃতদের ছেড়ে দেয়া হয়। এছাড়া শম্ভু দেবনাথের মরদেহ মৎস খামারে ভাসতে দেখে থানায় খবর দেওয়া হয়। মৃতদেহ পচে-গলে, ফোলা দিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। মাছে মুখমন্ডল খেয়ে বিকৃত করে দেয়। জানতে পেরে নিখোঁজ ডালিমের স্বজনরা ঘটনাস্থলে এসে বিলাপ করতে থাকেন। মরদেহ ডালিমের বলে দাবি করেন। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে ময়না তদন্ত শেষে মরদেহ হস্তান্তর করলে দাফন করা হয়। কিন্তু ফিঙ্গার প্রিন্টে সেটি নিখোঁজ শম্ভু দেবনাথের আইডি কার্ডের সঙ্গে ম্যাচ করে। তার মরদেহ উত্তোলন করে সৎকারের ব্যবস্থা করা হবে। উভয় ঘটনায় জৈন্তাপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। দু’টি হত্যা কাণ্ডের ঘটনায় খুনীদের সনাক্ত করতেও কাজ করছে পুলিশ।
জৈন্তাপুর উপজেলার ৬নং চিকনাগুল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, এক পথচারি এসে জানান মৎস খামারে একজন লোকের মরদেহ ভাসছে। মরদেহ উদ্ধারের পর নিহতের স্বজনরা দাবি করেন এটি ডালিমের মরদেহ। তারা কাপড় দেখে সনাক্ত করেন। এরপর পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ ঘটনাস্থলে আসেন। তারা থানা পুলিশকে নির্দেশনা দেন এলাকা ঘুরে দেখতে কোনো আলামত পাওয়া যায় কিনা? খোঁজতে গিয়ে একটি খুঁটিতে রক্তের ছোপ দেখতে পান। সেটিকে অনুসরণ করে আশপাশ এলাকা খুঁজতে গিয়ে মাটিতে পুতে রাখা মরদেহের হাত দেখতে পান। তাৎক্ষনিক হাতের ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করে সিআইডি। ওই ফিঙ্গার প্রিন্টের সঙ্গে নিহত ডালিমের ভোটার আইডির ফিঙ্গার প্রিন্টের মিলে যায়। তাতে সনাক্ত হয় পরে উদ্ধার হওয়া মৃতদেহটি ডালিমের। আর মৎস খামার থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহটি শম্ভু দেবনাথের। মৎস খামার থেকে উদ্ধার করা মরদেহ ডালিমের স্বজনরা ময়না তদন্ত শেষে দাফন করেছেন। এরপর দ্বিতীয় মরদেহটি ডালিমের সনাক্ত হওয়ার পর সেটিও ময়না তদন্ত শেষে দাফন করা হয়।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



