‘নৃশংসতা, নির্মমতা, বর্বরতা’ সব সজ্ঞাকেই যেনো হার মানিয়েছে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে প্রবাসীর স্ত্রীকে হত্যার ধরণ। কেটে ৬ টুকরো করা হলো নারীর দেহ। ঘটনাটি পৌর শহরের একটি ওষুধের দোকানে। কতটুকু নির্মম, নিষ্ঠুর হলে এ ধরণের রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে কেউ, সে প্রশ্ন এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে।
একই দিনে আরো দুই হত্যাকান্ডের খবর মিলে সুনামগঞ্জের ছাতকে চোখবাধা অবস্থায় যুবলীগ নেতার মরদেহ ডোবা থেকে উদ্ধার করা হয়। আর স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া অন্ত:স্বত্মা স্ত্রীর মৃতদেহ মিললো হবিগঞ্জের সাতছড়ি জঙ্গলে। হত্যার অভিযোগে আটক করা হয়েছে স্বামীকে। তিনটি ঘটনার মর্মান্তিকতা জাহেলি যুগকেও যেনো হার মানায়।
সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে একই দিনে ঘটলো নৃশংস তিন হত্যাকাণ্ড। বৃহস্পতিবার একই দিনে শিউরে ওঠা এমন ৩ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় হতবাক স্থানীয় লোকজনও। বিশেষ করে জগন্নাথপুর পৌর শহরের একটি মার্কেটে ফার্মেসীতে প্রবাসীর স্ত্রীকে কেটে ৬ টুকরো করা হয়। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড এরআগে দেখেননি এলাকার লোকজন। নারীর কাটা মরদেহ ভেতরে রেখে ফার্মেসী বন্ধ করে পালিয়ে যান কথিত চিকিৎসক জিতেন্দ্র গোপেশ।
বৃহস্পতিবার পুলিশ শহরের পৌর পয়েন্টের একটি মার্কেটের অভি মেডিকেল নামের এক ফার্মেসি থেকে শাহনাজ পারভীন জ্যোৎস্না (৩৫) নামে নারীর খণ্ডিত ছয় টুকরো মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।নিহত শাহনাজ পারভীন জ্যোৎস্না উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের নারিকেলতলা গ্রামের সৌদিপ্রবাসী ছরুক মিয়ার স্ত্রী।
নিহতের স্বজন ও পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৩ সাল থেকে পৌর শহরের নিজ মালিকানাধীন বাসায় সৌদিপ্রবাসীর স্ত্রী তাঁর তিন সন্তান নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। বাসার নিকটবর্তী ব্যারিস্টার আব্দুল মতিন মার্কেটে অভি মেডিকেল ফার্সেমিতে ওষুধ ক্রয় করতে যাতায়াত করতেন ওই নারী।
নিহত শাহনাজ পারভিনের ছেলে উদয়ের বরাত দিয়ে জানান, বুধবার সকালে অভি মেডিকেল হলের মালিক জিতেন্দ্র গোপ তাদের বাসায় গিয়ে পারভিনের ব্লাড প্রেশার মাপেন। পরে তিনি পারভিনকে ফার্মেসি যাওয়ার কথা বলে চলে যান। বিকেলে ওষুধ আনার উদ্দেশে পারভিন ঘর থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। রাতে উদয় তার মায়ের মোবাইল ফোনে কল দিলেও কেউ রিসিভি করেননি। বিষয়টি উদয় থানা পুলিশকে জানান। পরে বৃহস্পতিবার পুলিশ জিতেন্দ্র গোপের ফার্মেসি থেকে পারভিনের খন্ড-বিখন্ড লাশ উদ্ধার করে।
নিহতের ছোট ভাই তাঁর বোন বাসায় ফেরেননি জানতে পেরে ওই ফার্মেসিতে যান বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে। তখন ফার্মেসি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে ফার্মেসির মালিক জিতেশ চন্দ্র গোপকে মোবাইলে ফোন দিলে তিনি জানান, তাঁর বোন ওষুধ না পেয়ে চলে গেছেন। নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে পরিবারের লোকজন যোগাযোগ করলে অন্য এক নারী ফোন রিসিভ করে জানান, তিনি (নিহত নারী) ওসমানীতে আছেন। সেখানে যোগাযোগ করেও তাঁর সন্ধান মেলেনি। পরে আরেকবার ফোন দিলে একই নারী ফোন রিসিভ করে জানান, শহরের আর্ট স্কুল এলাকায় আছেন। এ রকম একেক সময় একেক কথা বলে বিভ্রান্ত করতে থাকেন ওই নারী। পরে পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে শাহনাজের ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। রাতভর বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করেও নিহত শাহনাজের সন্ধান না পেয়ে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে নির্বাহী হাকিম জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাজেদুল ইসলামের উপস্থিতিতে জগন্নাথপুর থানার পুলিশ তালাবদ্ধ অভি ফার্মেসির তালা ভেঙে দোকানে অভিযান চালায়। এ সময় দোকানের রোগী দেখার টেবিলের নিচে বিছানার চাদর দিয়ে মোড়ানো ওই নারীর শরীর ছয় টুকরা (গলা, পেট, হাত-পা) বিছিন্ন অংশ দেখতে পায় পুলিশ।
ঘটনার পর থেকে ফার্মেসির মালিক জিতেশ গোপ ও তাঁর পরিবার পলাতক রয়েছেন। জিতেশ গোপ কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার সইলা গ্রামের যাদব গোপের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পৌর শহরে বাসা ভাড়া করে বসবাস করে আসছিলেন। হত্যাকাণ্ডটি এর মধ্যেই শহরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কেন হত্যা করা হলো নারীকে? ব্যস্ততম এলাকায় কি করে হত্যা করা হলো। কেউ কেউ ধারণা করছেন, টাকার কারণে এ হত্যাকাণ্ড হতে পারে।
নিহতের ছোট ভাই হেলাল মিয়া জানান, গতকাল বুধবার তাঁর বোন ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করেছেন। তবে কত টাকা তুলেছেন তিনি তা জানেন না। তাঁর বোনকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি এই হত্যার বিচার চান। হেলাল জানান, তাঁর ভগ্নিপতি দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে থাকেন। বোনের পরিবারের সঙ্গে তিনি শহরে বসবাস করেন। নিহত নারীর এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে বলে তিনি জানান।
জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, পুলিশ ওই ফার্মেসির সিলিং থেকে একটি রক্তমাখা ছোরা উদ্ধার করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ছোরা দিয়েই শাহনাজকে হত্যা করা হয়েছে। লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ছাতকে যুবলীগ নেতা খুন: ছাতকে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হয়েছেন মিজান খাঁ (২৫) নামের এক যুবলীগ নেতা। তিনি নোয়ারাই ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। বৃহস্পতিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নোয়ারাই ইউনিয়নের জোড়াপানি গ্রাম সংলগ্ন লাফার্জ-হোলসিম কলোনির সামনের একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।মিজান খাঁ নোয়ারাই ইউনিয়নের বন্দেরগাঁও গ্রামের মনির খাঁর ছেলে ও লাফার্জ-হোলসিম সিমেন্ট কোম্পানির অস্থায়ী শ্রমিক।
বুধবার বিকেলে তিনি কোম্পানিতে ডিউটি করতে যায়। রাতে ডিউটি শেষে বাইসাইকেল যোগে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তরা রাস্তায় তাকে খুন করে ডোবার পানিতে ফেলে দিয়েছে এমন ধারণা করছেন স্থানীয়রা। তার গায়ে লাফার্জ-হোলসিম কোম্পানির ড্রেস রয়েছে এবং তার ব্যবহৃত বাইসাইকেলটি ও ডোবার পাশে পাওয়া গেছে। তার চোখ বাধা অবস্থায় পাওয়া যায়।
ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমান জানান, মরদেহ উদ্ধার করে সুনামগঞ্জ মর্গে পাঠানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের রহস্যজট ও জড়িতদের সনাক্ত করতে পুলিশি তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে।
স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে আসা নারীর মরদেহ মিলল সাতছড়িতে: হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ভেতর থেকে আছমা আক্তার (২৫) নামে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে নিহত নারীর স্বামীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চুনারুঘাট থানা পুলিশ উদ্যানটির ভেতরে লেবু বাগান থেকে আছমার মরদেহ উদ্ধার করে। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার আলমগীর মিয়ার স্ত্রী।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে তারা জানান, বৃহস্পতিবার সকালে আলমগীর ও তার স্ত্রী আছমা সিএনজি অটোরিকশাযোগে সাতছড়িতে বেড়াতে আসেন। দুপুরে উদ্যানের ফটক দিয়ে প্রবেশের পর একটু ভেতরে লেবু বাগানে আছমার মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে চুনারুঘাট থানা পুলিশ গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে।পরে আছমাকে হত্যার অভিযোগে তার স্বামী আলমগীরকে নাসিরনগর থেকে আটক করেছে।
চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলী আশরাফ জানান, আলমগীরের সঙ্গে প্রায় ৫ বছর আগে আছমার বিয়ে হয়েছিল। তাদের একটি শিশু সন্তান রয়েছে। সকালে দুইজন ঘুরতে আসার পর দুপুরে আছমার মরদেহ পাওয়া গেছে। মরদেহের গলায় কাপড় পেছানো ছিল। এ হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আলমগীরকে আটক করেছে নাসিরনগর থানা পুলিশ। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



