মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির জনকের প্রশ্নে আপোষহীন ছিলেন দেশবরেণ্য খ্যাতিমান কলামিস্ট, সাংবাদিক, বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমান। তিনি যে কোনো অসঙ্গতির বিষয়েই লিখতেন। যে কথাটি বিশ্বাস করতেন, সেটি সাহস নিয়ে বলতেন।
রোববার (০৬ জানুয়ারি) রাতে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অগ্রজ সহোদরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এসব কথা বলেন সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ।
সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমানের সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হলে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান সর্বস্তরের মানুষ। সেসময় সিলেটের বিশিষ্টজনেরা সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমানকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন।
সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ বলেন, অনেকেই জাতীয় পর্যায়ে গেলে আঞ্চলিক কিংবা এলাকার বিষয় নিয়ে লিখেন না, কথা বলেন না। কিন্তু তিনি (পীর হাবিব) স্নেহ, ভালবাসা, শ্রদ্ধা কেবল লেখনীর মাধ্যমেই অর্জন করতে পেরেছিলেন। নিজের মেধা, যোগ্যতায় জাতীয় পর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
রোববার সকালে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে তাঁর মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে দেশ বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ স্মৃতিচারণ করে বলেন- তিনি যে কথাটি বিশ্বাস করতেন, সেটি সাহস নিয়ে বলতেন, লিখতেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধ এবং জাতির জনকের প্রশ্নে কখনো আপোষ করতেন না। তিনি যে কোনো অসঙ্গতির বিষয়েই লিখতেন। বৃহত্তর সিলেট ও সুনামগঞ্জের প্রতি তার যে ভালবাসা, দরদ, সেটি তিনি জাতীয়ভাবে তুলে ধরতেন। সুনামগঞ্জকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তার লেখায়, কথায়-সুনামগঞ্জ প্রেমের শহর, জোছনার ও কবিতার শহর। এক কথায় সাংবাদিকতাকে ইবাদতের মতো মনে করতেন পীর হাবিব।
পীর মিসবাহ বলেন, ‘আমি নিজে সাক্ষি, হাসপাতালে থাকাবস্থায় প্রতি বুধবারে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনে কলাম লিখতেন। তার জীবনের শেষ কলামটি ছিল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আন্দোলন নিয়ে। সেদিন হাসপাতালের বেডে ডায়ালাইসিসের অবস্থায় তিনি শেষ কলামটি লিখেছিলেন।
আর শেষ বুধবারেও তিনি কলামটি লিখতে চেয়েছিলেন। এ জন্য তাঁর অনুজ একজন সাংবাদিককে হাসপাতালের কেবিনে আসতে বলেছিলেন এবং সেই অনুজ সাংবাদিক সেদিন সকাল বেলা এসেছিলেন। কিন্তু তাঁর শারিরিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় বলেছিলেন, ‘আমার শরীর খারাপ কথা বলতে পারছি না।’ অনুজ সাংবাদিককে ওইদিন বিকেলে আসার চেষ্টা করতে বলেন। তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি কষ্ট করে একটু বিকেলে এসো, আমি বুধবারের কলামটি লিখবো।’
বুধবার বিকেলের দিকে তিনি অনেকটা আনকনসাস অবস্থায় চলে যান। তখন তিনি আমাদেরকে বার বার বলছিলেন বিপুল কি এসেছে? পেশাটাকে তিনি ইবাদতের মতো মনে করতেন। সিলেটকে তিনি হৃদয়ে ধারণ করতেন।সিলেটের যেকোনো মানুষ যেকোনো বিষয়ে তাঁকে বললে, সামর্থের বাইরে হলেও মন প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করতেন। এলাকার প্রতি তাঁর এতো ভালবাসা ছিল। তিনি বার বার সিলেটের মানুষের সঙ্গে আড্ডা দিতে, ঘুরতে আসতেন। তার স্বভাবই ছিল প্রাণবন্ত জীবন এবং আড্ডা। সে জন্য তিনি সব জায়গাতে ছুঁটে যেতেন। পরিচিত জনকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। আড্ডার ছলে এলাকার সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে লিখতেন।
তিনি কোনো সুবিধা পাওয়ার আশায় কখনোই কারো পক্ষে লিখেননি। তিনি জানতেন কি লিখলে, কে তাঁর বিরুদ্ধে আক্রোশ পোষণ করতে পারেন। সেসব তিনি তোয়াক্কা করতেন না।
উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে পীর মিসবাহ বলেন, ‘আমার ভাই, আপনাদেরই সন্তান। তিনি বড় অকালে চলে গেছেন। তার এই চলে যাওয়াতে আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি কিছুদিন আগেও ক্যান্সার পাল্টিপোল মাইলোমাইতে অসুস্থ ছিলেন। ভারতে বোম্বাইতে চিকিৎসা নিয়ে ব্রনমেরো ট্রান্সপ্লান্ট করে সুস্থ হয়ে দেশে এসেছিলেন। তিনি খুব আনন্দিত ছিলেন রোগটি থেকে সেরে ওঠায়। তার ইচ্ছে ছিল নিজের আত্মজীবনী লিখার। বলেছিলেন-আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাকে যদি আরেকটু সময় দেন, তবে আমি আমার আত্মজীবনীটা লিখে যাবো, সন্তানের বিয়ে দেখবো।
ভারতের চিকিৎসকরা তাঁকে ৬মাস আইসোলেশনে থাকতে পরামর্শ দেন।তিনি ভারতে থাকাকালে চিকিৎসককে বলেছিলন, ‘আমি কবে আমার সুনামগঞ্জে যেতে পারবো?’ ৬মাস পর তিনি সুনামগঞ্জে ছুঁটে যান। যাওয়ার পর তিনি আবার অসুস্থ হন, আবার সুস্থ হন। গত মাসের ২০ তারিখে তার করোনা টেস্টে করালে ২২ তারিখে ফলাফল পজিটিভ আসে। এ অবস্থায় ঢাকার ল্যাব এইড হাসপাতালে ভর্তি করাই। কোভিডের কারণে তার কিডনী সমস্যা হয়। ক্রিটিনাইন পয়েন্ট বেড়ে যায়। ফলে তাকে ডায়লোসিসের প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়, বলে জানান পীর হাবিবের এই সহোদর।
তিনি বলেন, ‘সেখানে ৩টি ডায়লোসিস দেওয়ার পর ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে যান। ইতোমধ্যে পূণরায় তাঁকে ভারতে নেওয়ার চেষ্টায় যোগাযোগ করেন। এ অবস্থায় ছেলে অন্তর তখন হাসপাতালে। তখন ধানমন্ডি ২৭-এ অবস্থানকালেই অন্তর ফোন করে বললো বাবার অবস্থা খারাপ। চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বললে চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, তাকে নিয়ে বাইরে যাওয়া সম্ভব হবে না। তারপর সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ‘
পীর হাবিব সিলেটে অনেকের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর কথায়, আচরণে, লেখায় কেউ কোনো কষ্ট পেয়ে থাকলে পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করে পীর মিসবাহ বলেন- দয়া করে আল্লাহর ওয়াস্তে আমার ভাইকে ক্ষমা করে দিবেন। আর যদি কারো আর্থিক পাওনা থেকে থাকে, যোগাযোগ করলে আমরা দাবি পূরণ করে দেবো।
এরআগে রোববার রাত ১০টার দিকে পীর হাবিবুর রহমানের মরদেহ সিলেট কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে নিয়ে আসলে সেখানে শোকাবহ ও আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। ফুলেল শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি মরদেহের প্রতি সম্মান জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালন ও পরে মোতাজাত করে বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করা হয়।
সিলেট কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রাত ১১টার দিকে পীর হাবিবুর রহমানের মরদেহ নিয়ে সুনামগঞ্জের উদ্দেশে রওয়ানা হন স্বজনরা।
সোমবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টায় সুনামগঞ্জ পৌর শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে তাঁর মরদেহ। এরপর বাদ জোহর সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় মসজিদে এবং নিজ গ্রাম মাইজবাড়ীতে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে পিতা-মাতার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন পীর হাবিবুর রহমান।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



