সিলেট নগরের গোলাপবাগে সাজানো চাঁদাবাজি মামলায় গ্রেফতারকৃতদের পরিবারকে আপোষ মিমাংসার জন্য হুমকী দেওয়া হয়েছে। ভূমির মালিক আব্দুল মুকিত রমজানের ছেলেকে রাস্তায় পথরোধ করে এবং রমজানের জিডিতে সাক্ষি হওয়ায় মামলার আসামি দেখিয়ে গ্রেফতার করা আজিম উদ্দিন রাজুর স্ত্রীকে মোবাইল ফোনে হুমকী দেওয়া হয়েছে।
রোববার সকালে আব্দুল মুকিত রমজানের ছেলে সাইদ আহমদকে রাস্তায় গতিরোধ করে অজ্ঞাত ৪ যুবক হুমকি দিয়ে ইকবাল সাহেবের সঙ্গে ঝামেলা শেষ করতে বলে। এরপর ওইদিন দুপুরের দিকে রাজুর স্ত্রীকেও ফোন করে ইকবাল গংদের সঙ্গে ঝামেলা আপোষে শেষ করতে বলা হয়। নয়তো উভয় পরিবারকে ঝামেলা পোহাতে হবে, হয়রানী ও মামলার আসামি হতে হবে বলেও হুমকী দেওয়া হয়েছে।
আব্দুল মুকিত রমজানের ছেলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাইদ আহমদ বলেন, সকালে মোটরসাইকেলে অফিসে যাওয়ার সময় ৪ জন গতিরোধ করে বলে, ‘তোমার বাবাকে পুলিশ দিয়ে আটকাইছি, তুমি ইকবাল সাহেবের সঙ্গে সমস্যা সমাধান করো, নয়তো তোমাদের হয়রানী করা হবে, মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হবে। যেকোনো সময় যে কোনো কিছু করতে পারে।পরে আমরা এসবের দায়ভার নেবোনা।
তিনি বলেন, চার জনের পরনেই মাস্ক ছিল। তাদের কাউকে চিনি না। তখন তাদের হুমকির প্রেক্ষিতে বলি, আমি এখন অফিসে যাচ্ছি, এ বিষয়ে পরে আলাপ করবো, বলে ঘটনাস্থল ত্যাগ করি।
মামলায় গ্রেফতার হওয়া আজিম উদ্দিন রাজুর স্ত্রী বলেন, ‘শনিবার কাগজপত্র নিয়ে তার স্বামীকে থানা পুলিশে যাওয়ার কথা বলা হয়। সেখানে গেলে আমার স্বামীকে আটকে রাখা হহয়। রোববার থানা থেকে ফোন করে বলা হয় ইকবাল, ফরহাদ, শিপলুর সঙ্গে ভেজাল শেষ করতে। আর না হলে বিপদে পড়তে হবে। তারা ফোন দিয়ে থানার লোক পরিচয় দিয়েছে। অন্যথায় ঝামেলা পোহাতে হবে। এ ঘটনার পর আতঙ্কের মাঝে আছেন বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, নগরের গোলাপবাগের আব্দুল মুকিত রমজান মৌরসী ও তাহুর আহমদ শিব্বির খরিদা ভূমি জবর দখলের আশঙ্কায় শাহপরান (র.) থানায় গত ২৬ জানুয়ারি সাধারণ ডায়েরী (নং-১৪০৫) করেন। সাধারণ ডায়েরী তদন্তে আসা কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে তাদের স্বপক্ষে তথ্যপ্রমাণ পেলেও ২৯ জানুয়ারি জিডির বাদি ভূমির ২ মালিক ও জিডির দুই সাক্ষিকে আসামি করে শনিবার (২৯ জানুয়ারি গোপনে থানায় সাজানো মামলা (নং-২৯(০১’২২) রুজু করা হয়। মামলার বাদি করা হয় জনৈক ইকবাল হোসেনকে। তিনি একটি উগ্রবাদি সংগঠনের নেতা। জিডির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইবায়দুল্লাহ ওইদিন বিকেলে ভূমির মূল মালিককে কাগজপত্র নিয়ে নগরের শিবগঞ্জে দেখা করতে বলেন। আব্দুল মুকিত রমজান জিডির সাক্ষি আজিম উদ্দিন রাজুকে নিয়ে দেখা করতে গেলে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি মামলা আছে বলে গ্রেফতার দেখায়। অথচ এরআগে ২৭ জানুয়ারি ১৫ শতক ভূমির মালিকানার স্বপক্ষে কাগজাদি নিয়ে থানায় দরখাস্ত আকারে দিতে গেলেও পুলিশ রহস্যজনক কারণে তা গ্রহণ করেনি, উল্টো তাদের ফিরিয়ে দেয়।
এরআগে গত বুধবার (২৬ জানুয়ারি) তাহুর আহমদ শিব্বির ও আব্দুল মুকিত রমজান শাহপরান থানায় হাজির হয়ে দাখিলকৃত সাধারণ ডায়েরীতে উল্লেখ করেন, উক্ত থানাধীন সাদিপুর মৌজার ২য় খন্ড, জেএল-৯৮ এর ৪৬ এসএ খতিয়ানের অন্তভূক্ত নামজারি-৪৩২৯, এসএ ১৫২৭ দাগের ১৫ শতক ভূমির দখলদার তারা। এই ভূমির ভোগ দখল করে আসছেন। তাদের মালিকানা ভূমি নিতে বিআইডিসি এলাকার শিপলু, ফরহাদসহ অজ্ঞাত ৩/৪ জন জবর দখলের চেষ্টায় হুমকি-দামকি দেন। তারা মাটি ভরাট করতে গেলে শ্রমিকদের বিভিন্নভাবে হুমকী দেয়। সাধারণ ডায়েরীর তদন্তের দায়িত্ব পান থানার এসআই ইবায়দুল্লাহ। তিনি জিডির তদন্ত করতে ঘটনাস্থলে গিয়ে সত্যতা পান। প্রমাণ হিসেবে ছবিও তুলে আনেন।
জানা গেছে, রহস্যজনক কারণে উল্টো ভূমির মালিকের বিরুদ্ধে একটি উগ্রবাদি সংগঠনের নেতা ইকবাল হোসেনকে বাদি করে চাঁদাবাজি মামলা (নং-২৯(০১’২২) দায়ের করা হয়। অথচ ইকবাল হোসেন ওই ভূমির মালিক নয়। দক্ষিণ সুরমার তুড়ুকখলার শফিকুল হক চৌধুরীর ছেলে যুক্তরাজ্য প্রবাসী কামাল চৌধুরী ও তার স্ত্রী স্বপ্না চৌধুরীর ভূমির মালিক দাবিদার বানিয়ে তাদের পক্ষে দেখাশোনা করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করেন তিনি। ইকবাল হোসেন এজাহারে আরও বলেন, মাটি ভরাটে ঠিকাদার শিপলু আহমদ ও দেয়াল নির্মাণে নিয়োজিত ঠিকাদার ফরহাদকে কাজ বন্ধে নাকি ১০ লাখ টাকা দাবি করেছেন অভিযুক্তরা। অথচ চাঁদাবাজি মামলায় যাদের ঠিকাদার বলা হয়েছে, তাদের কোনো প্রতিষ্ঠানই নেই। মূলত শিপলু ও ফরহাদ ছাত্রদলের কুখ্যাত সন্ত্রাসী। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। ভূমি দখল করতে ও মামলায় সাক্ষি হিসেবে তাদেরকেই ব্যবহার করেছেন বাদি।
সূত্র জানায়, এরআগে শুক্রবার ও শনিবার সকাল পর্যন্ত অভিযোগকারী ইকবাল হোসেন তার মামলার সাক্ষিদের নিয়ে নগরের সুবহানীঘাটে জনৈক বিএনপি নেতার মালিকানাধীন ট্রান্সপোর্ট অফিসে বৈঠক শেষে পরিকল্পিতভাবে ভূমির মালিকদের বিরুদ্ধে সাজানো চাঁদাবাজি মামলার সিদ্ধান্ত হয়। সে মোতাবেক তড়িৎ গতিতে থানায় চাঁদাবাজি মামলা রেকর্ড করান। ওই মামলায় জিডি দায়েরকারী তফসীল বর্ণিত ভূমির আব্দুল মুকিত রমজান ও তাহুর আহমদ শিব্বির এবং জিডির দুই সাক্ষি আজিম উদ্দিন রাজু ও পিন্টুকে আসামি করা হয়।
তাছাড়া ওই স্থানে ১৫ শতক জায়গা থাকলেও ইকবাল হোসেন এজাহারে উল্লেখ করেন একই খতিয়ানের সাইল রকম ভূমি সাড়ে ৭ শতক। আর ভূমি উল্লেখ করেন সাইল রকম। অথচ জায়গাটির রকম ভিটভূমি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভূমির মালিক আব্দুল মুকিত রমজানের পূর্ব পুরুষ নুর বক্স ১৯৬১ সালে খরিদা সূত্রে ওই ভূমির মালিক। ১৯৬৯ সালে উত্তরাধিকারে ওই ভূমির মালিক হন রিয়াজ বক্স। এরপর রিয়াজ বক্সের নাতি হিসেবে আব্দুল মুকিত রমজান মৌরসী হিসেবে ৮ শতক ভূমির মালিক এবং অন্য অংশ ৭ শতকের মালিক তাহুর আহমদ শিব্বির। গত কয়েক বছর আগে রিয়াজ বক্সের নামে এসি ল্যান্ডের তদন্তক্রমে ভূমির নামজারিও হয়। উক্ত জায়গাতে কাজ করানোর জন্য ইট-বালি ও মাটি ভরাটের উদ্যোগ নেন ভূমির মূল মালিকদ্বয়। তাদের নিজস্ব সাইনবোর্ড টানানো ভূমিতে ইট-বালি রাখা ছিল। জিডির তদন্তে গিয়ে এর সত্যতাও পান থানার এসআই ইবায়দুল্লাহ। তিনি স্থির ও ভিডিও ধারণ করে নিয়ে আসেন। এরপর একই স্থানে চাঁদাবাজি মামলার সাক্ষিরা ইটের উপর ইট-বালুর উপর আরও মালামাল ফেলে ভিডিওচিত্র ধারণ করে নিয়ে আসেন এবং জিডির দায়েরকারী প্রকৃত মালিক ও তাদের সাক্ষিদের বিরুদ্ধে হয়রানীমূলক চাঁদাবাজি মামলা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
যদিও এ ব্যাপারে শাহপরান (র.) থানার ভারপ্রাপ্ত (ওসি) সৈয়দ আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, প্রাথমিক সত্যতার ভিত্তিতে মামলা রুজু করা হয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। তারা জড়িত না থাকলে মুক্তি পাবে। বরং পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



