দফায় দফায় ভূমিকম্পে কাঁপলো সিলেট। চারদফা ভূমিকম্পের কারণে নগরজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ৪ বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বার বার ভূমিকম্পের ফলে নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন পরিবার পরিজন নিয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েন। বিশেষ করে বহুতল ভবনের বাসিন্দারা ফ্লাট বাসা ছেড়ে নেমে পড়েন আতঙ্কে। অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ছুটে যেতে দেখা যায়। কেইবা আত্মীয় স্বজনের টিন বাসায় আশ্রয় নেন।
শনিবার (২৯ মে) বেলা ২টায় সর্বশেষ ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এতে প্রবল ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে ধরণী। ওই সময় রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১। এর আগে সকাল ১০টা ৩৬ মিনিট, ১০টা ৫০ মিনিট ৫৩ সেকেন্ড ও ১১টা ২৯ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডে এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
ভুমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মেট্রোলজিস্ট মমিনুল ইসলাম জানান, সর্বশেষ বেলা ২টায় প্রবল ঝাঁকুনিতে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এটির উৎপত্তিস্থল সিলেটের আশপাশে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক শূণ্য। এরআগে সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ভূমিকম্পের রিখটার স্কেল ছিল ৩ দশমিক শূন্য। দ্বিতীয় ঝাঁকুনি ১০টা ৫০ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডে রিখটার স্কেলের মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১। ১১টা ২৯ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডে ২ দশমিক ৮ মাত্রায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। চারটিরই উৎপত্তিস্থল সিলেটের আশপাশে। ঢাকা থেকে উত্তর পূর্বে এর অবস্থান।
তিনি আরো বলেন, ডাউকি ফল্টের কারণে সিলেট ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা। যে কারণে জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ সীমান্তের দিকেই এর উৎপত্তিস্থল।
ভুমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন জানান, সর্বশেষ বেলা ২টায় সিলেটে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এরআগে একঘন্টার মধ্যে পর পর তিনবার ভূমিকম্প হয়েছে। ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ সিসমিক জরিপে সকাল ১০টা ৫০ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডে ৪ দশমিক ১ মাত্রায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বাকি দু’টি হালকা কম্পন অনুভূত হয়। বেলা ২টায় সর্বশেষ ভূমিকম্প অনুভূত হয়। চারটিরই উৎপত্তিস্থল সিলেট জোনের মধ্যে। ঢাকা থেকে এর উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ১৯৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম বলেন, ছোট ছোট ভূমিকম্পগুলো বড় ভূমিকম্পের বার্তা বহন করে। আগামী ৭/১০ দিন সিলেটের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই সবাইকে সচেতন থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, বেলা ২টার দিকে যে ভূমিকম্প হয়েছে, তা সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের কাছে উৎপত্তিস্থল। বাকি কম্পনগুলোও সিলেটের আশপাশে হয়েছে। তাই সিসিক মেয়রকে প্রস্তুতি নিতে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তিনি যেনো ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ বিভাগ, গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখেন। যাতে এ ধরণের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আগেই সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এদিকে, ভূমিকম্পের কারণে সিলেট নগরের পাঠানটুলা এলাকায় ৬তলা বিশিষ্ট দু’টি ভবন হেলে পড়ে। খবর পেয়ে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, উপ পুলিশ কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখসহ সিসিকের প্রকৌশলী দল এবং পুলিশের অধস্থন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এসময় বাসার বাসিন্দাদের নিরপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেন মেয়র।
নগর ছেড়েছেন বাসিন্দাদের অনেকে: একদিনে চার বার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় অনেকে ভয়ে বাসা ছেড়ে পরিচিত কোন টিনশেডের বাসায় সাময়িকভাবে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে। অনেক বাসিন্দা ভয়ে নগর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে দেখা যায়।
নগরের গার্ডেন টাওয়ারের বাসিন্দা মাহমুদ হোসেন বলেন, ভূমিকম্প আতঙ্কে সিলেট নগরের গার্ডেন টাওয়ারের অন্তত ৮/১০ পরিবার বাসা ছেড়ে নিরপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন।একইভাবে নগরের উপশহর বহুতল ভবন স্প্রীং টাওয়ার, মাল্টিপ্লান, সুবিদবাজার এক্সেল টাওয়ার, টিলাগড়ের কয়েকটি ভবনের বাসিন্দারাও নিরাপদ আশ্রয়ে অন্যত্র ছুটে যেতে দেখা যায়।
নগরের সুবিদবাজারের বাসিন্দা আখতার হোসেন বলেন, ভূমিকম্প আতঙ্কে পরিজন গ্রামের বাড়ি বড়লেখায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। কেননা, বাড়িতে রয়েছে টিনশেডের ঘর। এ কারণে গ্রাম অনেকটা নিরাপদ।
কন্ট্রোল রুম, হট লাইন চালু: ঘন ঘন ভূমিকম্পের কারণে পরিস্থিতি মোকাবেলায় সতর্কতামুলক ব্যবস্থা গ্রহণের জরুরী সভা করেছে সিলেট সিটি কর্পোরেশন। স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর ও শাখার লোকজনের সঙ্গে নিয়ে শনিবার (২৯ মে) বিকেলে নগরভবনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে এক দিনে অল্প সময়ে অন্তত ৪ বার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় পরবর্তী ৭ দিনের মধ্যে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের আশংকা রয়েছে। সে অনুযায়ী সিলেট সিটি কর্পোরেশন দূর্যোগ মোকাবেলায় বিশেষ পর্যবেক্ষন ও প্রস্তুতি গ্রহন করতে এই সভার আয়োজন করে। জরুরী সভা থেকে নগরবাসিকে আতংকিত না হয়ে সচেতন ও দূর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরীর সঞ্চালনায় সভায় সভাপতিত্ব করেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এ পরিস্থিতিতে সিলেট সিটি কর্পোরেশন নিজস্ব একটি কন্ট্রোল রুম খুলেছে। দূর্যোগ পরিস্থিতিতে সিলেট মহানগরে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে সকল বিভাগ, শাখা ও দপ্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করা। খোলা হয় একটি হটলাইন। যার নম্বর ০১৯১১-২৪৯৬৯৯। সভায় দূর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী জরুরী ভিত্তিতে সিলেটের সকল প্রশাসন, দপ্তর ও সেবা স্ংস্থা সমূহে নিজ নিজ কন্ট্রোল রুম খুলতে অনুরোধ জানানো হয়। আগামী ৭ দিনের জন্য সিলেট সিটি কর্পোরেশন সহ সকল জরুরী সেবা সংস্থা সমূহ ও সহযোগি সকল দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা কতৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সর্তক অবস্থায় থাকার অনুরোধ জানান হয়। বিশেষ করে ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ, গ্যাস, স্বাস্থ্য সেবা খাত এবং দূর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষন প্রাপ্ত সেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত থাকার জন্য প্রয়োজনী ব্যবস্থা গ্রহনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিসিকের ২৭ টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলরদের নেতৃত্বে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত সেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে দূর্যোগ পরবর্তি ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনাতে প্রস্ততি মূলক ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় হয়।
এদিকে, সিলেটের সকল সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতাল ক্লিনিকের দূর্যোগকালিন সময়ে চিকিৎসা সেবা দান নিশ্চিতে প্রস্তুতি গ্রহনের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়া সিসিকের তালিকাভূক্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সমূহ থেকে নাগরিকদের নিরাপদে অবস্থানে থাকার আহবান জানান।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



