মনে ক্ষোভ নিয়েই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন বীর মুক্তিযোদ্ধা রমজান আলী। সিলেট নগরের শিবগঞ্জ একটি বাসায় স্বপরিবারে ভাড়া থাকতেন তিনি। সরকার থেকে পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা সম্মানীভাতা দিয়ে কোনোমতে বাসা ভাড়া ও পরিবারের খচর মেটাতেন।গত চার মাস যাবত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা না পাওয়ায় টানাপোড়েনে দিন কাটে।
আটকে যায় কয়েক মাসের বাসা ভাড়া। বাসা ছাড়তে সাফ জানিয়ে দেন বাড়ির মালিক। এ অবস্থায় সতীর্থ মুক্তিযোদ্ধাদের অনুরোধে বাসার মালিক তাড়িয়ে দেননি।
এরপর রমজান মাসেই পরপারে পাড়ি জমান এই মুক্তিযোদ্ধা। সতীর্থদের সহযোগীতায় হয় দাফন-কাফন। কিন্তু পবিত্র ঈদুল ফিতরেও তার পরিবার ভাতা পায়নি।জ্যৈষ্ঠ মাস পেরিয়ে গেলেও বৈশাখী ভাতাও পায়নি তাঁর পরিবার!
এ অবস্থা কেবল রমজান আলীর পরিবারের নয়। নগরের যুগলটিলার মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত দীপেন্দ্র মোহন দাস, দক্ষিণ সুরমার গোটাটিকরের হীরেন্দ্র দাস, আবুল কাশেমের পরিবারকেও বাসা ভাড়া না দিতে পারায় বাসা ছেড়ে দিতে মালিকপক্ষ সাফ জানিয়ে দেয়। ভাতা আটকে যাওয়া সিলেটের অগণন মুক্তিযোদ্ধা পরিবার একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে দ্বারস্থ হন মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমাণ্ডের।
একই অবস্থা উপজেলাগুলোতেও। অনেক মুক্তিযোদ্ধারা মাসের পর মাস সম্মানী ভাতা ও বৈশাখী উৎসব ভাতা পাননি। পবিত্র ঈদুল ফিতরের সময় আশায় বুক বেধে থাকলেও ব্যাংক থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে যান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ে ডাটা ব্যাজে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ আনুসাঙ্গিক ভুলের কারণে অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধারা সম্মানী ভাতা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। এমনটি স্বীকার করেছেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরাও।
জানা গেছে, মহানগর মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ড ইউনিট বিলুপ্তির পর প্রশাসক হিসেবে রয়েছেন জেলা প্রশাসক।একইভাবে উপজেলা ইউনিট কমাণ্ডগুলো সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা প্রশাসক হিসেবে রয়েছেন। ভাতা বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধারা সরকারি দফতরগুলোতে বার বার ধর্না দিয়েও আশার বানী ব্যাতিরেকে কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না।
ভাতা বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার বর্গের অভিযোগ, নতুন করে ডাটা ব্যাজ তৈরীতে সব ধরনের তথ্যউপাত্ত ও কাগজাদি দেওয়ার পরও সংশ্লিষ্টদের ভুলের কারণে আমরা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। কোথাও গিয়ে কোনো সুরাহা পাচ্ছি না। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনে গেলে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে, জানানো হচ্ছে-হয়েছে-বলেই সান্তনা দেওয়া হয়।
সিলেট মহানগর মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমাণ্ডের সাবেক কমাণ্ডার ভবতোষ বর্মণ বলেন, মহানগর ২২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। ইতোমধ্যে অন্তত ২৫ জন মারা গেছেন। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৪ হাজারের উপরে মুক্তিযো্দ্ধা রয়েছেন। অনেকে ভাতার টাকা দিয়ে বাসা ভাড়া দেন। তাদের অনেকের ৩/৪ মাসের ভাড়া আটকে থাকায় মালিক বাসা থেকে বের করে দিচ্ছে। এ ধরণের বেশ কয়েকজনের সমস্যার সমাধান করে দিতে নিজেও এগিয়ে গেছেন।বিশেষ করে পবিত্র ঈদুল ফিতরের সময় আশায় বুক বাধলেও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলো ভাতা পায়নি। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি খুবই আন্তরিক। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা ভাতা অনিয়মিত হওয়ার বিষয়টি খুবই দু:খজনক।
তিনি বলেন, নগর এলাকায় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার জ্যৈষ্ঠমাসে এসেও বৈশাখী উৎসব ভাতা পায়নি। এই সমস্যা নিয়ে জেলা প্রশাসনে কয়েকবার গেলেও সমাধান মিলেনি। মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কেউ ফোন ধরেন না। এরইমধ্যে অনেক মুক্তিযোদ্ধা মারা গেছেন, যাদের অনেকের দাফন কাফন নিজে থেকেই করতে হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তর সিলেটের উপ পরিচালক নিবাস রঞ্জন দাশ বলেন, মুক্তিযোদ্ধারাসহ সিলেটে ৯০ হাজার ভাতাভোগী আছেন। এমআইএস এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরাসরি যাতে টাকা তাদের অ্যাকাউন্টে চলে যায় সে জন্য ডাটা ব্যাজ তৈরী করছে মন্ত্রণালয়। এই কাজ ধাপে ধাপে হওয়াতে অনেকের টাকা পেতে বিলম্ব হচ্ছে। আবার ডাটাব্যাজ তৈরীতে সফটওয়্যারে এনআইডি নাম্বারসহ আনুসাঙ্গিক তথ্য ভুল অথবা বিলীন হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক ভাতাভোগীরা ভাতা পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, মহানগরে ২০০ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ভাতাভোগী রয়েছেন। এরমধ্যে ভাতা পেয়েছেন ১০০ জনের মতো। এছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় ৪ হাজার ২০০ জন মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। তাদের তথ্য উপজেলা থেকে সরাসরি মন্ত্রণালয়ে চলে যায়। যে কারণে কতজন ভাতা পাননি সে তথ্য তাদের কাছে নেই।
এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও মহানগর মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমাণ্ডের প্রশাসক এম. কাজি এমদাদুল ইসলামকে মোবাইল ফোনে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এদিকে, ৪ মাস ধরে ভাতা বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধাদের অর্ধশতাধিক পরিবার মঙ্গলবার (২৫ মে) ব্যাংকের দারস্থ হলেও শূণ্য হাতে ফিরে যান।
এ নিয়ে কথা হলে তারা অভিযোগ করেন, প্রায় ৪ মাসের অধিক সশয় ধরে তারা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন না। এর মধ্যে অনেকের ভারতীয় তালিকাসহ অন্যান্য তালিকায় নাম রয়েছে। সারা দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের বেতন, ভাতা, বৈশাখী ভাতা ও ঈদ বোনাস প্রদান করা হয়। কিন্তু অজানা কারনে সিলেটের মুক্তিযোদ্ধারা এসব ভাতা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে
তারা বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা না পাওয়ায় সুদ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান সরকার আমলে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোকে যেসব সুযোগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। যা কোন সরকারের বেলায় তা হয়নি। তবে এই সমস্যা থেকে প্রতিকার পেতে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করছে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলো।
সম্পাদক: এসএম নাসির উদ্দিন।
উপ সম্পাদক: দেওয়ান জাকির হোসেন।
যোগাযোগ: পশ্চিম জিন্দাবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: natunsylhetnews@gmail.com
মুঠোফোন: ০১৭১৫৫০১১৫১
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পুর্ন বে-আইনি।



